, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 30° সে. | 💧 আদ্রতা 78%

গ্যাস সংকটের অজুহাতে খাতুনগঞ্জে বাড়ছে চিনির দাম

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে আবারও বাড়তে শুরু করেছে চিনির দাম। ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, চট্টগ্রামে চলমান গ্যাস সংকটকে কারণ দেখিয়ে কয়েকটি পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় তৈরি হয়েছে কৃত্রিম সংকট। এর প্রভাব পড়েছে পাইকারি বাজারে।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) চিনির দাম প্রায় ২০০ টাকা বেড়েছে। দুই সপ্তাহ আগে যে চিনি ৩ হাজার ৬০০ টাকা মণে বিক্রি হয়েছে, বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ টাকায়।

চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কেজিডিসিএলের আওতাধীন এলাকায় গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪৫ শতাংশ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। এতে আবাসিক গ্রাহকের পাশাপাশি শিল্পকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে গ্যাস সংকটের প্রভাব চিনির বাজারে ঠিক কতটা পড়েছে, সেটি নিয়ে রয়েছে ভিন্নমত। বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, গ্যাস সংকটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কিছু মিল বাজারে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের দাবি, সরবরাহ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আগাম লেনদেন ও ‘ডেলিভারি অর্ডার’ বা ডিও-ভিত্তিক বেচাকেনা।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বাজারে পণ্য হাতে আসার আগেই ডিও স্লিপের মাধ্যমে একাধিক দফায় লেনদেনের ঘটনা ঘটে। বাজারদর বেড়ে গেলে নির্ধারিত দামে পণ্য সরবরাহে অনীহা তৈরি হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত মজুতের তুলনায় বেশি ডিও বাজারে ছাড়ার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হয়। এতে পণ্যের প্রকৃত সরবরাহ ও বাজারদরের মধ্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে বাজারে সিন্ডিকেটের অভিযোগের সঙ্গে একমত নন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন। তাঁর মতে, ভোগ্যপণ্যের বাজারে দাম ওঠানামা স্বাভাবিক এবং এর পেছনে চাহিদা-জোগানের ভূমিকা রয়েছে। কোনো পণ্যের দাম বাড়লেই সিন্ডিকেটের অভিযোগ তোলা ঠিক নয় বলেও তিনি মনে করেন।

অন্যদিকে, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসেনের অভিযোগ, দেশের চিনির পরিশোধন ও বিপণন খাতে বড় কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে। কার্যকর নজরদারি থাকলে বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

এর আগে বিভিন্ন সময়ে খাতুনগঞ্জে চিনির দাম সরবরাহ পরিস্থিতি, আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনেও সরবরাহ সংকটের অভিযোগের মধ্যে দুই সপ্তাহে প্রতি মণে চিনির দাম ৬০ টাকা পর্যন্ত বাড়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারের চিত্রকে পুরোপুরি অপরিবর্তিত বলা যাচ্ছে না। International Sugar Organization-এর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শুরুতে নিউইয়র্কভিত্তিক র’ সুগারের দৈনিক মূল্য ১৫.৫৪ সেন্ট থেকে ১১ আগস্টে ১৭.২৮ সেন্টে উঠেছিল। ১৮ আগস্ট নিউইয়র্ক র’ সুগার ফিউচার ১৭.৪৭ সেন্ট এবং লন্ডন হোয়াইট সুগার ৫৩৯.৫০ ডলার প্রতি টনে পৌঁছায়।

ফলে খাতুনগঞ্জে সাম্প্রতিক চিনির মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজার, স্থানীয় সরবরাহ পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয় ও বাজার ব্যবস্থাপনা—কোন কারণটি কতটা দায়ী, তা স্পষ্ট করতে প্রয়োজন নিয়মিত বাজার তদারকি। একই সঙ্গে সরবরাহ সংকটের অজুহাতে কোনো পক্ষ কৃত্রিমভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন ভোক্তারা।

খাতুনগঞ্জে চিনির বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি নজরদারির পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ যাচাইয়ে দ্রুত পদক্ষেপের প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভোক্তা প্রতিনিধিরা।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত