শহীদ জননী জাহানারা ইমামের স্মরণে কিছু কথা -মো. কামাল উদ্দিন।

আজ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের স্মরণ কিছু কথা বলার আগে আমি এই মহিষী নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাচ্ছি। উনার নেতৃত্বে ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনের চিত্র আমি দেখেছি তিনি এই আন্দোলন করতে গিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহী মামালার আসামী হয়েছিল, সেই মামলা মাথায় নিয়ে তিনি ১৯৯৪ সালে ২৬ শে জুন আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিল, উনার মৃত্যুর পর আমি তাঁর উপর চট্রল চিত্রে প্রথম সংখ্যায় লেখা লিখেছিলাম। তখন চট্রল চিত্র ম্যাগাজিনে নির্বাহী সম্পাদক ছিলাম। আজ আবারও তাঁর স্মৃতি ময় কথা নিয়ে এই লেখাটি উপস্থাপন করলাম।শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগ্রামী মা এবং সাহসী লেখিকা, ২৬ জুন, ১৯৯৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবন এবং সংগ্রামের কাহিনী প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চিরন্তন স্মৃতি হয়ে রয়েছে। জাহানারা ইমাম শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধার মা ছিলেন না, তিনি নিজেই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক অগ্রগামী যোদ্ধা।

জীবনী জাহানারা ইমাম ১৯২৯ সালের ৩ মে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সৈয়দ আবদুল আলী এবং মায়ের নাম সাঈদুন্নেসা খাতুন। শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন এবং এক সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রভাষক হিসেবে কাজ করেছেন মুক্তিযুদ্ধ এবং শহীদ জননী হিসেবে খ্যাতি

জাহানারা ইমামের জীবনে সবচেয়ে বড় এবং মর্মান্তিক অধ্যায় ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। তাঁর বড় ছেলে, শাফি ইমাম রুমী, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং শহীদ হন। রুমীর শহীদ হওয়ার পর জাহানারা ইমাম ও তাঁর পরিবার গভীর শোকের মধ্যে ডুবে যান। তবুও তিনি হার মানেননি, বরং আরও শক্তি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কাজ করে গেছেন। ১৯৯২ সালে তাঁর লেখা “একাত্তরের দিনগুলি” প্রকাশিত হয়, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলির স্মৃতিচারণা করা হয়েছে। এই বইটি তাঁকে “শহীদ জননী” উপাধি এনে দেয় এবং বাঙালি জাতির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অমূল্য সংযোজন হিসেবে স্থান করে নেয়।

মৃত্যু এবং উত্তরাধিকার

১৯৯৪ সালের ২৬ জুন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে সারা দেশ শোকাভিভূত হয়েছিল। জাহানারা ইমামের জীবন ও সংগ্রাম আমাদের সবাইকে প্রেরণা দেয় এবং জাতির মুক্তির জন্য তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুদিবসে আমরা তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি এবং তাঁর স্মৃতিকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। তাঁর আদর্শ আমাদের সামনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার প্রেরণা জোগায় এবং আমাদের দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রামে অনুপ্রেরণা দেয়।

ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, যা শহীদ জননী জাহানারা ইমাম নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল। ১৯৯২ সালে তাদের প্রতীকী “গণআদালত” পরিচালনা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার কারণে, তৎকালীন সরকার তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করে।

মামলার আসামিদের তালিকা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন ছিলেন:

জাহানারা ইমাম – শহীদ জননী এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রধান উদ্যোক্তা।

শাহরিয়ার কবির বিশিষ্ট লেখক, সাংবাদিক, এবং মানবাধিকার কর্মী।

বজলুর রহমান – প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং সম্পাদক।

মুনতাসীর মামুন ইতিহাসবিদ এবং লেখক।আহমদ রফিক লেখক এবং মনীষী।মাহফুজ আনাম – সাংবাদিক এবং সম্পাদক।

সারওয়ার আলী সাংস্কৃতিক কর্মী এবং মুক্তিযুদ্ধেরব ইতিহাসবিদ।

মামলার বর্তমান অবস্থা মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া কিছুটা কঠিন হতে পারে, তবে কিছু মূল পয়েন্ট উল্লেখ করা যেতে পারে:

মামলার ধীরগতি মামলাটি এক পর্যায়ে ধীর গতিতে চলতে থাকে এবং বেশ কিছু বছর পর মামলার কার্যক্রম তেমনভাবে অগ্রসর হয়নি।

আদালতের স্থগিতাদেশ বিভিন্ন সময়ে আদালত থেকে মামলার কার্যক্রম স্থগিত বা বিলম্বিত হওয়ার ঘটনা ঘটে।

বিচার প্রক্রিয়ার সমাপ্তি অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, এবং শেষে মামলার আসামিরা হয়তো আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অব্যাহতি পান বা মামলাটি নিষ্পত্তি হয়।

সাম্প্রতিক অবস্থা বর্তমানে ২০২৪ সালে এসে,ঐতিহাসিকভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) গঠন করা হয় এবং অনেক যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন হয়েছে। তবে, জাহানারা ইমাম এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার নির্দিষ্ট আপডেট বা সমাপ্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য অনুপস্থিত। তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা বর্তমানে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, কারণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আজও এই নেতাদের অবদান স্বীকৃত। জাহানারা ইমাম এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। তাঁদের সাহসী উদ্যোগ এবং আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁদের অবদান আমরা আজও গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।

লেখকঃ সাংবাদিক, গবেষক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও মহাসচিব -চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।

[recent_tabs]