দেশে ছাগল আলোচনা তুঙে-মো. কামাল উদ্দিন। 

ছাগলদের সম্পর্কে আলোচনা এখন একটি মজার বিষয়। প্রাকৃতিকভাবে এটিরা সহনশীল এবং ব্যবহারকারী প্রাণীরা, যা সমাজের বিভিন্ন দিকে আমাদের মতামত পুনরায় চিন্তা করার কারণ হতে পারে। তাদের স্বভাবের সহজতম ও সাধারণ বৈশিষ্ট্য তাদেরকে আমাদের জীবনের অনেক দিকে আস্থা এবং সম্মান অর্জন করে। তবে, কিছু মানুষ ছাগলদের ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত না হওয়া দ্বারা তাদের সম্পর্কে অদম্য মতামত রাখতে পারে, যা বিশেষভাবে সমাজের সঙ্গে তাদের মধ্যে একটি চুক্তি সৃষ্টি করতে সমর্থন করতে পারে। ছাগলদের সম্পর্কে আমাদের কী জানা থাকে? বেশ কিছু মানুষ ছাগলকে সমালোচনা করেন, আর কিছু তাদের প্রশংসা করেন। কিন্তু সত্যিই এই প্রাণীটির উপর আমাদের এতো গভীর বিচার কি আছে? ছাগল সম্পর্কে কম বেশি সবারই একটি মতামত রয়েছে। যারা তাদের সম্পর্কে উচ্চ প্রশংসা করে, তারা উল্লেখ করে যে ছাগলগুলি সম্পর্কপ্রিয়, সহনশীল, এবং প্রতিবাদশী। তাদের মতে, ছাগলদের প্রকৃতির মধ্যে মজার একটি তুলনামূলক ভাব রয়েছে, তারা হাঁটতে, খেতে এবং আরামে থাকতে অত্যন্ত পরিপক্ক। অন্যদিকে, কিছু লোক ছাগলদের সম্পর্কে তুলনা মূলকভাবে উচ্চমান করেন। তাদের মতে, ছাগলরা কাছাকাছি সাধারণভাবে অবস্থান করা যাবে না, এবং তাদের দেখতে অসুন্দর হতে পারে। এছাড়াও, কিছু মানুষ মনে করেন ছাগলরা ব্যবহার করা সহজ নয় এবং তাদের সম্পর্কে বুদ্ধিমত্তা ছাড়া স্নান করানো একটি অমান্য প্রতিষ্ঠা।

সত্যি কথা হচ্ছে, ছাগলদের সম্পর্কে আমাদের অনেক কিছু জানা থাকলেও তাদের প্রতি আমাদের সম্পর্কজীবন পরিবর্তন করে না। তাদের সম্পর্কে মতামত দিতে গিয়ে আমরা বিশ্বাস করি যে ছাগলরা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি এবং তাদের প্রকৃতির মধ্যে একটি অদ্ভুত সম্পর্ক রয়েছে।

ছাগলে কি না খায় কথায় আছে-পাগলে কিনা বলে, ছাগলে কি না খায়। সুকুমার রায়ের হযবরল-এর মন্ত দাড়িওয়ালা ছাগল শ্রীব্যাকরণ শিং বি.এ. খাদ্যবিশারদ কিন্তু এ কথার প্রতিবাদ করেছে। বলেছে যে কথাটা পুরোপুরি সত্যি নয়। তারা অনেক জিনিস খায় বটে, যেমন-খাবারের ঠোঙা, কিংবা নারকেলের ছোবড়া কিংবা খবরের কাগজ কিংবা সন্দেশের মতো ভালো মাসিক পত্রিকা কিন্তু তা বলে মজবুত বাঁধানো বই তারা কখনও খায় না। কুচিৎ কখনও লেপ তোষক বালিশ কিংবা কম্বল তারা এক আধটু খেলেও খাটপালং, চেয়ার টেবিল কখনও খায় না। শ্রীব্যাকরণ শিংদের কিন্তু আমরা ছাগল ছাড়া অন্য নামেও চিনি। এই নামগুলো হচ্ছে-ছগল, ছগলক, ছাগ, অজ, অগ্নিবাহক, অগ্নিবাহন, বুক্ক ও মেধ্য। ছাগ শব্দটি এসেছে ছো ধাতুর সঙ্গে কৃৎ প্রত্যয় গক্ (গ) যোগ করে। ছো ধাতুর অর্থ হচ্ছে ছেদন করা। যজ্ঞে এই প্রাণীটিকে ছেদন বা বলি দেয়া যায় বলে এটি ছাগ। সংস্কৃত পণ্ডিতরা বলেন-পার্ষতৈঃ (মাংসৈ) যাজ্ঞ। ছাগ এর সঙ্গে ল (স্বার্থে) যোগ করে হয়েছে ছাগল। আবার ছাগল থেকে এসেছে ছগল বা ছগলক।অজ শব্দটি বিশ্লিষ্ট করলে দাঁড়ায় ন জ (যে জন্মে) অর্থাৎ যে জন্ম না-সেই অর্থে ঈশ্বর, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব। এর দ্বিতীয় অর্থ মেষ বা ছাগ।শব্দটিকে অজ্ ধাতুর সঙ্গে অন (তৃ) প্রত্যয় যোগ করেও নিষ্পন্ন করা যায়।

অজ ধাতুর একটি অর্থ হচ্ছে গমন। সে অর্থে যে প্রাণী গমন করতে পারে সেটিই অজ। প্রাণী অর্থাৎ ছাগল অর্থে অজ শব্দটির সমমূলীয় শব্দ হচ্ছে আবেস্তায় Buza, পাহলভিতে Buj, ফারসিতে বুজ, গ্রিকে Aiz বা Aigos. এ থেকে ধারণা করা যায়, শব্দটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর এবং প্রাণীবাচক শব্দ হিসাবে এটি সংস্কৃত ভাষায় এসেছে। পণ্ডিতরা পরে সংস্কার করে শব্দটিকে জাতে তুলেছেন।

হিন্দুশাস্ত্রে আছে, দক্ষের যজ্ঞস্থলে সতী শিবনিন্দা সহ্য করতে না পেরে প্রাণ ত্যাগ করেছিলেন। শিব তা জানতে পেরে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য বীরভদ্রকে পাঠান। সে ও শিবের অন্য অনুচররা এসে প্রজাপতি দক্ষের যজ্ঞস্থল লণ্ডভণ্ড করে। দক্ষের মুণ্ড ছিঁড়তে না পেরে বীরভদ্র তাঁকে যুপকাষ্ঠে ফেলে শিরশ্ছেদ করে, মাথা ফেলে দেয় যজ্ঞস্থলির আগুনে। ব্রহ্মা এসময় অস্পৃশ্য ছাগদেহ ধারণ করে পালিয়ে যান। পরে অবশ্য শিব সন্তুষ্ট হয়ে দক্ষকে বাঁচিয়ে দেন এবং বলেন যে তিনি ছাগমুণ্ডধারী হবেন। সংস্কৃতে পণ্ডিতরা যে অজ শব্দের প্রথম অর্থ ঈশ্বর, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব ও দ্বিতীয় অর্থে মেষ বা ছাগ করেছেন তার সঙ্গে এই ঘটনাটির যোগ থাকা বিচিত্র কিছু নয়। এখানে বলে রাখি-অজ শব্দের প্রাচীন অর্থ ছিল মেষ। কালের বিবর্তনে পরে এটি ছাগলের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়ায়।ছাগল প্রধানত চামড়া, মাংস ও দুধের জন্য পালন করা হয়। চামড়ার জন্য পোষে ব্ল‍্যাক বেঙ্গল ও মুবেত্তি জাতের ছাগল।মাংসের জন্য পালন করে ব্ল‍্যাক বেঙ্গল, বোয়ার, যমুনাপাড়ী, ফিজিয়ান ও মেট-অ জাত। আর দুধের জন্য হলে পুষতে হয় ম্যানিন, অ্যাংগোরা, দামাস্কাস, সুদানিজ ও বারবারি জাত।

পাঁঠা, খাসি, বকরা/বকরি বললেও আমরা ছাগলকেই বুঝি। ছাগলের ক্ষেত্রে যেসব বিশেষণ প্রয়োগ করি তার একটি তালিকা-কালা, কেলে, খুদে, ঘরপোষা, দেশি, বিদেশি, নধর, পাহাড়ি, বন্য, লম্বকর্ণ ও রাম। আর ছাগির বিশেষণ হিসাবে আমরা এগুলো ছাড়াও ব্যবহার করতে পারি-গাভিন, বিয়ন্ত, দুধেল ইত্যাদি। ছাগলকে নিয়ে সৃষ্ট প্রবচন-গাছ মুড়ালে ছাগলে, বাড়ে না কোন কালে; ছাগলে কী না খায়, পাগলে কী না বলে; বারোয় কুত্তা পাগলা, তেরোয় ছাগলা; ছাগল দিয়ে ক্ষেত চষা; ছাগল দিয়ে ধান মাড়ানো ইত্যাদি। এছাড়া ছাগলের মত অল্পকেশ দীর্ঘ দাড়িকে আমরা বলি ছাগলাদাড়ি। আর ছাগলবুদ্ধি বললে বুঝি বোকা। ছাগলাদ্যমৃত মানে খাসির চর্বি থেকে তৈরি ওষুধ।

ছাগলের প্রতিশব্দ হিসাবে অগ্নিবাহ বা অগ্নিবাহন এসেছে হিন্দুদের দেবতা অগ্নি থেকে। অগ্নি ছাগলের পিঠে চেপে বেড়ান বলে প্রাণীটির নাম অগ্নিবাহন বা অগ্নিবাহ। যজ্ঞে বা পূজায় পশুটি বলি দেয়া চলে বলে এর আরেক নাম মেধ্য। বুক্ত শব্দটিও ছাগলের প্রতিশব্দ। তবে এটি বাংলায় তেমন প্রচলিত নয়। এর আরেকটি অর্থ হচ্ছে কুকুরের রব। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘কুহু ও কেকা’ কবিতায় এই শব্দটি ব্যবহার করে লিখেছেন, ‘কুকুর তুলে বুক্কন ধ্বনি’। শব্দটি তৈরি হয়েছে বুক্ক ধাতুর সঙ্গে অ (অচ্) প্রত্যয় যোগ করে।

 

নীতিগল্পে এই পশুটি নিরীহ ও বোকা হিসাবেই পরিচিতি পেয়েছে। ঈশপের গল্পে আছে, একবার এক শিয়াল গভীর গর্তে পড়ে গিয়ে কিছুতেই আর উঠতে পারছিল না। এমন সময় সেখানে এক পিপাসার্ত ছাগল এসে উপস্থিত। সে শিয়ালকে বলল, ভাই এ গর্তে কি ভাল জল আছে। শিয়াল বলল, আছে মানে। সারা বছর খেলেও ফুরোবে না। ছাগল একথা বিশ্বাস করে লাফ দিয়ে গর্তে পড়ে। আর এই সুযোগে শিয়াল তার পিঠে লাফ দিয়ে চড়ে গর্তের ওপরে উঠে এসে হেসে বলল, তোর যে পরিমাণ দাড়ি সে পরিমাণ বুদ্ধি থাকলে তুই কক্ষণও আমার কথা শুনে লাফ দিয়ে গর্তে পড়তিস না।

ছাগলের মত ভেড়াও নিরীহ পশু। শুধু নিরীহ নয়, ভীতুও। এটি খুবই প্রাচীন প্রাণী। ঋগ্বেদ ও যজুর্বেদেও এদের উল্লেখ রয়েছে। ভেড়ার প্রতিশব্দ হচ্ছে মেষ, ভেড়া, গড্ডর, গড্ডল ও উরত্র।

 

ভেড়ার নাম ভেড়া হওয়ার পেছনে পণ্ডিতদের যুক্তি-শব্দটি এসেছে ভী ধাতুর সঙ্গে ডফ প্রত্যয় যোগ করে প্রথমে ভেড়; এর সঙ্গে আ যোগ করে ভেড়া। এর অর্থ করতে গিয়ে বলা হয়েছে, এই প্রাণীটি যখন লড়াইয়ের স্পর্ধা করে তখন মনে হবে সত্যিই যোদ্ধা। কিন্তু আসলে সে ভীতু। শব্দটির আরেকটি নিষ্পত্তি এরকম-ভী + রব ভৈরব; এই ভৈরব থেকে ভেড়ব অর্থাৎ ভীরুর ডাক। পরে ভেড় ও ভেড়া। মেষ এই প্রকৃতির মানে ভীরু বলেই ভেড়া। বাচ্চা ভেড়াকে বলে বর্কর।

 

বাস্তবেও দেখা যায়, ভেড়া খুব ঘটা করে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নামে বটে কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তার পরিসমাপ্তি ঘটে। সেজন্যই সংস্কৃতে শ্লোক রচিত হয়েছে, ‘অজাযুদ্ধে ঋষিশ্রাদ্ধে প্রভাতে মেঘডম্বরে। দম্পত্যোঃ কলহে চৈব ববারম্ভে লঘুক্রিয়া।’ অর্থাৎ খুব হাঁকডাক করে ভেড়ার যুদ্ধ, শ্রাদ্ধ, ভোরবেলা আকাশে মেঘের শব্দ ও স্বামী-স্ত্রীর কলহ শুরু হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই সেগুলো শেষ হয়ে যায়। অথবা বলা যায়, যত গর্জে তত বর্ষে না।

বাংলায় ভেড়াকে নিয়ে সৃষ্ট প্রবচন-খুঁটার জোরে ভেড়া লড়ে বা খোঁটার জোরে মেড়া লড়ে। এর মানে হচ্ছে, আশ্রয়ের বলে আশ্রিতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তুলনীয়, গডফাদারের দৌলতে সন্ত্রাসীর দাপট। ভারতচন্দ্র তাঁর কবিতায় বলেন, পড়িলে ভেড়ারশৃঙ্গে ভাঙ্গে হীরা-ধার। অর্থাৎ যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর কবলে পড়লে জেতা কঠিন। ভেড়ার মতো কেউ ভীতু হলে আমরা বলি ভেড়াকান্ত। স্ত্রীভীত স্বামীদের ক্ষেত্রে এটি বহু ব্যবহৃত বিশেষণ। ভেড়ুয়া এই শব্দটিরই রকমফের। ছাগল বা ভেড়া ডাকে ভ্যা ভ্যা করে। কান্নার আগে অনেক সময় আমরা এই ভ্যা ভ্যা বিশেষণ যোগ করি। যেমন ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছিস কেন?ভেড়ার প্রতিশব্দ হিসাবে বাংলায় মেড়া এসেছে সংস্কৃত মেট্র থেকে। প্রাকৃতে শব্দটি মেডঢ। আধুনিক ভাষাবিদগণ বলেন যে মেড়া ও কম্বল-দুটো শব্দই অস্ট্রিক ভাষার। মেষ শব্দটি নিষ্পন্ন করা হয়েছে এভাবে-মিষ ধাতুর সঙ্গে অ (অচ্)-ক (স্পর্ধাকারক)। অর্থাৎ যে স্পর্ধা করে। মেষের সঙ্গে শাবক যুক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে মেষশাবক। বাংলায় এর প্রয়োগ নিরীহ অর্থে। বাইবেলের যিশু মেষ চরাতেন। তাঁর কোলে থাকত মেষশাবক। এটি মানব জাতি ও ভালবাসার প্রতীক।

নিরীহ এই প্রাণীটি আদিকাল থেকেই মানুষের জন্য যুগিয়ে আসছে মাংস ও পশম। মেষের মাংস সম্পর্কে বলা হয়, কচি পাঁঠা বৃদ্ধ মেষ। অর্থাৎ অল্পবয়স্ক পাঁঠা ও বয়স্ক মেষের মাংস খেতে স্বাদু। বেদের আমল থেকে দেখি মেষের লোম দিয়ে তৈরি হচ্ছে প্রাবরণ বা কম্বল ও পরিধেয় বস্ত্র। প্রসঙ্গত ভারতে আসার আগে পর্যন্ত আর্যরা সুতা বা সুতিবস্ত্রের সঙ্গে পরিচিত ছিল না। তারা ব্যবহার করত মেষলোম দিয়ে তৈরি বস্ত্র।

 

এই মেষ আবার হিন্দুদের বাগদেবীর বাহনও। আমরা অবশ্য হংসবাহিনী দেবী সরস্বতীর সঙ্গেই বেশি পরিচিত। আজও ভারতের কোন কোন এলাকায় স্বরস্বতী পূজোতে মেষ বলি দেয়ার প্রথা রয়েছে।

মেষ পরিচিত গড্ডর বা গড্ডল হিসাবেও। শব্দটি অর্বাচীন সংস্কৃত। এটি থেকেই এসেছে গড্ডরিকা বা গড্ডলিকা। মূল অর্থ, মেষের দল যে মেষীকে অনুসরণ করে। সাধারণভাবে মেষীর অনুগামী মেষ পঙ্ক্তি। বাংলায় গড্ডরিকা পরিত্যক্ত শব্দ। আর গড্ডলিকাপ্রবাহ বললে আমরা বুঝি মেষযুথের মেষীকে অনুসরণ। সহজভাবে বলতে গেলে অনুসরণ।

লেখকঃ সাংবাদিক গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক ও মহাসচিব, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।

[recent_tabs]