
মো. কামাল উদ্দিনঃ
ড. মুহাম্মদ ইউনুস যখন দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেন, তখন সময়টা ছিল ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের। সদ্য স্বাধীন দেশের মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করছিল, এবং কবর দেওয়ার জন্যও জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। তিনি তখন অর্থনীতির শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু শিক্ষার জ্ঞান আর বাস্তবতার সংঘাতে হৃদয় স্পর্শ করে তাঁকে। গ্রামের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘুরে ঘুরে তিনি দেখেছিলেন মানুষের বাঁচার আকুতি, ক্ষুধার যন্ত্রণা, আর শুনেছিলেন সেই অসহায় মানুষের আহাজারি। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা তাঁকে এতটাই স্পর্শ করে যে, তিনি দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সেই যুদ্ধের ফলস্বরূপই আজকের বিশ্বের অন্যতম গরীবের ব্যাংক হিসেবে পরিচিত গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা। মাত্র ৮৫৬ টাকা বিনিয়োগ করে শুরু হয়েছিল এই ব্যাংকের পথচলা, আর সেই পথচলা কীভাবে দারিদ্র্য বিমোচনে সফল হয়েছিল, সেই কাহিনি ড. ইউনুস তাঁর জীবনী গ্রন্থ “গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন”-এ লিখেছেন। এই কাহিনি কোনো গল্প নয়, বরং বাস্তবতার নিরিখে লেখা এক সত্য ঘটনা। তাঁর নিজের লেখা থেকে আমি হুবহু তুলে উপস্থাপন করছি। এই সংস্করণটি আপনার প্রয়োজন মেটাবে।দারিদ্র্য বিমোচনে গ্র্যামীণ বাংক প্রতিষ্ঠায় ৮৫৬ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন ড.মুহাম্মদ ইউনুস – তিনি যেই সময় দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলেন তখন ৭৪ সালের দুরভিক্ষ চরমে, সদ্য স্বাধীন দেশের মানুষ অনাহারে মারা যাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে – কবর দেওয়ারও সমার্থ নেই, তিনি অর্থনীতির শিক্ষক হয়ে বাস্তবতা কোল মিলা মিল না পাওয়াতে সরাসরি গ্রামের এই প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে ঘুরে মানুষের বাঁচার জন্য আকুতি শুনে খাদ্যের আহা হার দেখে ক্ষুদ্ধত্ব মানুষের আহাজারি দেখে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে আজকের এই বিশ্বের অন্যতম গরীবের ব্যাংক
হিসেবে পরিচিত গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এই ব্যাংকের সূচনা লগ্নে মাত্র ৮৫৬ টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে কি ভাবে তিনি দারিদ্র্য বিমোচনে সফলতা অর্জন করেছিলেন তা উনার জীবনী গ্রন্হ “গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন” এ উনি নিজের কথা গুলো আমি তুলে ধরবো – এই কাহিনি কোন গল্প নয়, বাস্তবতা নিরিখে তিনি এই সত্যি কথা লিখেছেন- তিনি যাহা লিখেছেন আমি তা হুবহু তুলে উপস্থাপন করলাম–জোবরা গ্রাম পাঠ্যপুস্তকের পাতা থেকে বাস্তবে ১৯৭৪ হল সেই বছর যা আমার অস্তিত্বের শিকড় ধরে নাড়া দিয়েছিল। সেবার বাংলাদেশ ভয়ংকর দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে।
উত্তরের প্রত্যন্ত গ্রাম ও জেলা-শহরগুলি থেকে অনাহার ও মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হতে লাগল সংবাদপত্রগুলিতে। যে-বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি অর্থনীতির বিভাগীয় প্রধান ছিলাম তা ছিল দেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে। প্রথমে আমি এ ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগ দিইনি। ক্রমশ ঢাকার রেলস্টেশন ও বাস স্ট্যান্ডগুলিতে কঙ্কালসার মানুষের দেখা মিলতে লাগল। অনতিবিলম্বে দু-চারটে মৃতদেহ পড়ে থাকার খবর আসতে লাগল। ঢাকায় বুভুক্ষু মানুষের ঢল নামল, যা শুরু হয়েছিল এক ক্ষীণ ধারার মতো।
সর্বত্র অনাহারী মানুষের ভিড়। এমনকি মৃত ও জীবিত মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠল। পুরুষ নারী ও শিশুদের মধ্যে কোনও তফাত করা সম্ভব হয়ে উঠছিল না। বৃদ্ধদের দেখাচ্ছিল শিশুদের মতো
। অন্যদিকে শিশুদের চেহারা বৃদ্ধদের মতো। এসব মানুষকে শহরের এক জায়গায় জড়ো করে খাবার দেবার উদ্দেশ্যে সরকার পক্ষ থেকে লঙ্গরখানা খোলা হল। কিন্তু এগুলির সামর্থ্য ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
কী ভয়ংকর ঘটনা ঘটে যাচ্ছে সে ব্যাপারে সংবাদপত্রগুলি জনগণকে সতর্ক করে চলছিল। গবেষণা কেন্দ্রগুলি প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছিল কোথা থেকে এত ক্ষুধার্ত মানুষের মিছিল আসছে? তারা জীবিত থাকলে আবার কি নিজেদের জায়গায় ফিরে যেতে পারবে? তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সম্ভাবনা আছে? ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি প্রথা অনুযায়ী লাশ দাফনে তৎপর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু শীঘ্রই এই মৃতদেহগুলি সংখ্যায় এত বেড়ে যেতে লাগল যে তাও দুঃসাধ্য হয়ে উঠল। চেষ্টা করলেও এদের না দেখে কারুর নিস্তার ছিল না। তারা সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল একেবারে নিথর, নিস্পন্দ হয়ে। তারা কোনও স্লোগান উচ্চারণ করেনি। তারা আমাদের কাছে কিছু দাবিও পেশ করেনি। আমরা বাড়িতে অতিশয় তৃপ্তিকর আহার করছি বলে আমাদের ধিক্কারও দেয়নি। শুধু তারা নিশ্চলভাবে আমাদের দুয়ারে শায়িত ছিল। মানুষের মৃত্যুর নানা উপায় আছে। কিন্তু অনাহারে মৃত্যু সেগুলির মধ্যে সবচেয়ে করুণ। কী মর্মান্তিক উপায়ে মৃত্যু। এই পরিণতি খুব ধীরে ধীরে ঘটছিল। প্রতি মুহূর্তে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান কমে আসছিল।
এক পর্যায়ে জীবন মৃত্যুর সঙ্গে এত অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেল যে তাদের মধ্যে তফাত করাই দুষ্কর হয়ে উঠল। রাস্তায় অসহায়ভাবে পড়ে থাকা মা ও শিশু এই পৃথিবীর না অন্য গ্রহের মানুষ তাই যেন সন্দেহ হতে লাগল। মৃত্যু আসছিল এত নিঃশব্দে, এত নিষ্ঠুরভাবে, কেউ যেন তার হাহাকার শুনতেও পাচ্ছিল না।
এত সব ঘটছিল শুধু একজন দুবেলা একমুঠো খেতে পাচ্ছিল না বলে। এত প্রাচুর্যময় জগতে একজন মানুষের অন্নের অধিকার এত মহার্ঘ? চারপাশে আর সবাই যখন উদরপূর্তি করছে তখন তাকে অভুক্ত থাকতে হচ্ছে। ছোট্ট শিশু যে এখন বিশ্বের কোনও রহস্যেরই সন্ধান পায়নি সে শুধু একটানা কেঁদেই চলেছে-শেষে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে তার প্রয়োজনীয় দুধটুকুর অভাবে। পরের দিন তার সেই কান্নার শক্তিটুকুও আর থাকল না অর্থনীতির তত্ত্বগুলি কীভাবে সব অর্থনৈতিক সমস্যার সহজ সমাধান করে দেয় এই বিষয় ছাত্রদের পড়াতে পড়াতে আমি রোমাঞ্চ অনুভব করতাম। এই সব তত্ত্বের সাবলীলতা ও চমৎকারিত্ব আমাকে অভিভূত করত। এখন আমার মনে এক অদ্ভুত শূন্যতার সৃষ্টি হল। যখন মানুষ ফুটপাতে ও ঘরের দুয়ারে অনাহারে মরে পড়ে থাকছে তখন এসব সুচারু তত্ত্বের মূল্য কী? ক্লাসঘরগুলো আমার কাছে মনে হতে লাগল সিনেমার মতো যেখানে অবাস্তব কল্পনাবিলাসে হারিয়ে যাওয়া যায়। কারণ আমরা নিশ্চিত জানি এখানে নায়ক অবশেষে জয়ী হবেই। এতদিন আমি জানতাম সমস্ত অর্থনৈতিক সমস্যার একটা সুন্দর সমাধান রয়েছে। কিন্তু ক্লাসঘর থেকে বেরিয়েই আমি কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে থাকলাম। এখানে নিরীহ মানুষেরা নির্দয়ভাবে মার খাচ্ছে ও পিষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিনের জীবন আরও দুঃসহ খারাপের দিকে যাচ্ছে। তাদের একমাত্র নিয়তি হচ্ছে অনাহারে মৃত্যুবরণ।
অর্থনীতির এইসব তত্ত্বে কঠোর বাস্তবের প্রতিফলন কোথায়? অর্থনীতির নামে আমি ছাত্রদের কী করে মনগড়া গল্প শোনাব।
এইসব পাঠ্যপুস্তক, গুরুগম্ভীর তত্ত্ব থেকে আমি নিষ্কৃতি পেতে চাইলাম, বুঝলাম শিক্ষার জগৎ থেকে আমাকে পালাতে হবে। দরিদ্র জনগণের অস্তিত্ব ঘিরে যে কঠিন বাস্তব তা আমি আন্তরিকভাবে বুঝতে চাইলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের গ্রাম জোবরায় জীবনমুখী অর্থনীতিকে আবিষ্কার করতে উদ্যোগী হলাম।
কপাল ভাল, জোবরা গ্রাম একদম আমার বিশ্ববিদ্যালয় সীমানার লাগোয়া। ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খান ১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের দ্বারা পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতায় এসেছিলেন এবং ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত অধিষ্ঠিত ছিলেন স্বৈরাচারী সামরিক শাসনকর্তা হিসেবে। ছাত্রসমাজের প্রতি তাঁর মনোভাব ছিল অত্যন্ত বিরূপ। ‘এরাই যত গণ্ডগোলের মূল’ এই আশঙ্কায় সব বিশ্ববিদ্যালয় তিনি স্থাপন করেছিলেন শহর থেকে বহু দূরে, যাতে ছাত্রদের রাজনৈতিক বিক্ষোভ জনবহুল শহর অঞ্চলের শান্তি বিঘ্নিত না করে।
তাঁর শাসনকালে স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির একটি হল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। এর জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল জোবরা গ্রামের কাছাকাছি পাহাড় ঘেরা এক অঞ্চল।
স্থির করলাম আমি আবার নতুন করে ছাত্র হব এবং আমার বিশ্ববিদ্যালয় হবে জোবরা গ্রাম, গ্রামবাসীরা হবেন আমার শিক্ষক।প্রতিজ্ঞা করলাম গ্রাম সম্বন্ধে সব কিছু জানার ও শেখার ঐকান্তিক চেষ্টা করব। মনে হল একজন গরিব মানুষের জীবনও যদি আমি সম্পূর্ণ ভাবে বুঝতে পারি তো ধন্য হব। পুঁথিগত শিক্ষার বাইরে এটাই হবে আমার মুক্তি। পাখির মতো দূর আসমান থেকে দেখার পদ্ধতিতে শিক্ষাদান করে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি। এর ফলে ছাত্রদের জীবন ও বাস্তব জীবনের মধ্যে এক বিরাট ব্যবধান সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। বহু দূর থেকে দেখে গোটা পৃথিবীর জ্ঞান হাতের মুঠোয় মনে করলে মানুষ স্পর্ধিত হবেই। সে অনুমান করতে পারে না যে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করলে সব জিনিসকেই ঝাপসা দেখায় এবং তখন প্রকৃত দৃষ্টির অভাব পূরণ করে কল্পিত ধারণা।
আমি চাইলাম সব কিছু একটি কীটের মতো খুব কাছ থেকে দেখতে ও তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করতে। সোজা পথে যদি কোনও বাধা আসে তো আমি একটি ছোট্ট কীটের মতোই বিকল্প পথের সন্ধান করব এবং ক্রমাগত চেষ্টায় লক্ষ্যে পৌঁছবই। আমার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করে তুলব।
অসংখ্য অভুক্ত মানুষের যে ঢল নেমেছে ঢাকা শহরের বুকে, তার পরিপ্রেক্ষিতে নিজেকে চরম অপদার্থ বলে মনে হতে লাগল। শহরের নানা স্থানে সমাজকল্যাণমূলক সংস্থাগুলো খাবার দেবার ব্যবস্থা করেছিল। প্রতিবেশী অঞ্চলগুলো বুভুক্ষু মানুষদের খাদ্য সংগ্রহের জন্য বিশেষভাবে চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু প্রতিদিন একজনের পক্ষে কতজনের অন্ন জোগানো সম্ভব? আমাদের চোখের সামনে দুর্ভিক্ষ তার করাল ছায়া নিয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল।
আমার ভূমিকাকে অন্যভাবে সংজ্ঞা দিয়ে নিজেকে অপদার্থ ভাবার গ্লানি থেকে মুক্তি পাবার চেষ্টা করলাম। নিজেকে বোঝালাম যে বহু মানুষকে সাহায্য করতে না পারলেও মাত্র একদিন বা কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও একজন দুর্গতের প্রয়োজনে লাগার ক্ষমতা আমার আছে। সেটাই আমার পক্ষে হবে বিরাট প্রাপ্তি। শুধুমাত্র তত্ত্ব উচ্চারণ না করে যদি অন্তত একজন মানুষকেও সাহায্য করা যায় তাতেও সার্থকতা। এই ভাবনা আমাকে বিরাট শক্তি দিল। নিজেকে পুনরুজ্জীবিত মনে হল। আমি যখন জোবরা গ্রামে গরিব মানুষদের পারিবারিক অবস্থা পরিদর্শন করতে শুরু করলাম তখন আমি কী করতে চাই এবং কেন করতে চাই এ সম্বন্ধে মনে একটা স্পষ্ট ধারণা তৈরি করে নিয়েছিলাম। আমার চিন্তা এত প্রাঞ্জল এর আগে কখনও মনে হয়নি।
গ্রামবাসীদের প্রত্যক্ষ কোনও সাহায্যে আসতে পারি কি না তা দেখার জন্য আমি জোবরা গ্রামে যাতায়াত শুরু করলাম। আমার সহকর্মী, অধ্যাপক লতিফী আমার সঙ্গে থাকতেন। গ্রামের প্রায় সব পরিবারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। গ্রামের মানুষজনকে অতি সহজেই
আপন করে নেবার ক্ষমতা ছিল তাঁর সহজাত। গ্রামের তিনটি পাড়ায় মুসলমান, হিন্দু ও বৌদ্ধ পরিবারের বাস। বৌদ্ধদের সঙ্গে আলাপ করার সময় আমরা সঙ্গে নিতাম আমাদের ছাত্র দীপালচন্দ্র বড়ুয়াকে, জোবরা গ্রামের এক দরিদ্র বৌদ্ধ পরিবারের সন্তান সে। যে-কোনও কাজে লাগবার জন্য সে স্বেচ্ছায় প্রস্তুত
থাকত। একদিন লতিফী ও আমি জোবরা গ্রামে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে একটি জীর্ণ কুঁড়েঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। এক মহিলা বাঁশের মোড়া বানাচ্ছিলেন। জীবনধারণের জন্য কঠোর সংগ্রামের চিহ্ন তাঁর চোখে মুখে।লতিফীকে বললাম, “আমি ওঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই।” গাছগাছালি এবং খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত মুরগি ডিঙ্গিয়ে লতিফী আমাকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন। “বাড়িতে কেউ আছেন?” লতিফীর গলায় আত্মীয়তার সুর।নমহিলাটি তাঁর নিচু খড়ের চাল দেওয়া, ধুলোভরা দাওয়ায় বসে সম্পূর্ণভাবে হাতের কাজে তাঁর দুই হাঁটুর মধ্যে একটি অর্ধসমাপ্ত মোড়া। দুহাতে কঞ্চি মুড়ে মুড়ে তিনি মগ্ন হয়েছিলেন। তাঁর দুই হাঁট বিনুনি করছিলেন। লতিফীর স্বর শোনামাত্র তিনি কাজ ফেলে তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে বাড়ির ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেলেন। লতিফী বলল, “ভয় পাবেন না। আমরা অচেনা কেউ নই। দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই। আপনাদের প্রতিবেশী। আপনাদের শুধু ক’টা প্রশ্ন করব, আর কিচ্ছু না।” লতিফীর উষ্ণ ও মমত্বপূর্ণ ব্যবহারে আশ্বস্ত হয়ে তিনি মৃদুস্বরে জবাব দিলেন, “এখন বাড়িতে কেউ নেই।” তিনি বোঝাতে চাইলেন সেই মুহূর্তে বাড়িতে পুরুষমানুষ অনুপস্থিত। বাংলাদেশের গ্রামে মহিলাদের অনাত্মীয় অচেনা পুরুষের সঙ্গে বাক্যালাপ নিন্দনীয়।
দাওয়ায় উলঙ্গ শিশুরা দৌড়াদৌড়ি করছিল। প্রতিবেশীরা জড়ো হয়ে অবাক চোখে আমাদের জরিপ করছিল। ভাবছিল আমাদের আসার উদ্দেশ্য কী হতে পারে। মুসলমান পাড়ায় মহিলাদের সাক্ষাৎকার নেবার সময় আমাদের কথোপকথন করতে হত চিকের আবডাল থেকে। পর্দা প্রথা অনুসারে বিবাহিতা নারীকে বাইরের জগৎ থেকে একদম নির্বাসিতের মতো থাকতে হত। এই নিয়ম চট্টগ্রাম জেলাতে খুব কড়াভাবে পালন করা হত। সেক্ষেত্রে দোভাষীর মতো কাজ করার জন্য আমি আমার ছাত্রীদের ব্যবহার করতাম।
আমি চট্টগ্রামের মানুষ। স্থানীয় ভাষা আমার জানা। তাই এদের বিশ্বাস অর্জন করা
কোনও বাইরের লোকের তুলনায় আমার পক্ষে সহজ হয়েছিল। তা সত্ত্বেও কাজটা খুবই কষ্টসাধ্য ছিল।আমি বাচ্চাদের ভালবাসি। মায়ের কাছে তাঁর সন্তানের প্রশংসা করা তাঁকে সহজ হতে দেবার সবচেয়ে স্বাভাবিক উপায়। আমার মায়ের সন্তান সংখ্যা চৌদ্দ (যার মধ্যে ন জন জীবিত আছি)। মায়ের তৃতীয় সন্তান আমি। ভাইবোনদের খাওয়াতে খাওয়াতে ও কাঁথা পালটাতে পালটাতে বড় হয়েছি। বাড়িতে সামান্য অবসর পেলেই আমি ভাইবোনদের কোলে তুলে দোল দিতাম। এই অভিজ্ঞতা কার্যক্ষেত্রে উপকারী ভূমিকা পালন করছিল।
একইভাবে সেখানে শিশুদের একটিকে কোলে তুলে নিলাম। সে কাঁদতে শুরু করল ও প্রাণপণে মার কাছে দৌড় লাগাল। মা তাকে কোলে তুলে নিলেন।
লতিফী জিজ্ঞাসা করল, “আপনার ছেলেমেয়ে ক’টি?”
জবাব এল, “তিনজন।”
“চমৎকার ছেলেটি”, আমি বললাম। আশ্বস্ত মা বাচ্চা কোলে করে দরজায় এসে দাঁড়ালেন। তাঁর বয়স কুড়ির কাছাকাছি। রোগা শরীর, ময়লা রং, চোখদুটি গভীর ঘন কালো। পরনে তাঁর লাল একটি শাড়ি। লক্ষ লক্ষ মহিলা, যাঁরা অভাবের তাড়নায় উদয়াস্ত পরিশ্রম করেন, তাঁদের প্রতিনিধি মনে হল তাঁকে।
“আপনার নাম কী?”
“সুফিয়া বেগম।”
সেই ভার দিয়েছিলাম।
আমি কোনও নোটপ্যাড বা কলম সঙ্গে নিইনি পাছে তিনি সন্ত্রস্ত হন। পরের বার ছাত্রদের
“এই বাঁশ কি আপনার নিজের?”
“হ্যাঁ।” “কী করে এগুলো জোগাড় করলেন?”
“কিনেছি।”
“কত দাম নিল?”
“পাঁচ টাকা।”
“আপনার পাঁচ টাকা আছে?”
“না। আমি পাইকারদের কাছ থেকে ধার করে আনি।””তার সাথে আপনার বন্দোবস্ত কী?””দিনের শেষে মোড়াগুলো তার কাছেই বেচতে হবে দেনা শোধ করার জন্য। তারপর যা বাঁচবে তাই আমার লাভ।””কত টাকায় একটা বেচেন?””পাঁচ টাকা পঞ্চাশ পয়সা।”
“তা হলে আপনার লাভ হল পঞ্চাশ পয়সা।”তিনি সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন। তার মানে মোট লাভ হল পঞ্চাশ পয়সা মাত্র।
“আপনি টাকা ধার করে নিজে কাঁচা মাল কিনতে পারেন না?””হ্যাঁ পারি। তবে মহাজন অনেক সুদ নেয়। যারা ধার নেওয়া শুরু করে তারা আরও গরিব হয়ে যায়।” “মহাজন কত টাকা সুদ ধার্য করে?”ঠিক নেই। কখনও শতে দশ টাকা প্রতি সপ্তাহে। আমার এক প্রতিবেশী তো প্রতিদিন শতে দশ টাকা সুদ দিচ্ছে।”
“তা হলে এত চমৎকার মোড়া বোনার বিনিময়ে আপনার আয় এত কম? প্রতিটিতে পঞ্চাশ পয়সা মাত্র।””হ্যাঁ।” তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সুদের হার এত সুনির্দিষ্ট ও স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে গ্রহীতা পর্যন্ত খেয়াল করেন না এই রকম চুক্তি শোষণের নামান্তর মাত্র। গ্রাম বাংলায় ধান লাগাবার শুরুতে ধার করা এক মণ ধান ফসল কাটার সময় শোধ দিতে হয় আড়াই মণ ধান দিয়ে। অন্য আরও পন্থাও আছে। জমিকে বন্ধকী হিসেবে ব্যবহার করলে তার পুরো মালিকানা ঋণদাতার দখলে থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত আসল শোধ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই ঋণদাতার অধিকার কায়েম করার জন্য বায়নানামা করা হয়। ধার শোধ কষ্টসাধ্য করে তোলার জন্য ঋণদাতা কিস্তিতে পরিশোধে রাজি থাকেন না। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাবার পর মহাজন সেই জমি পূর্ব নির্ধারিত দামে কিনে নেবার অধিকার লাভ করে। মহাজনের জমিতে বেগার খাটা টাকা পাবার আর এক উপায়।
দাদন পদ্ধতিতে চাষের জন্য মহাজন অগ্রিম ঋণ দান করেন এই শর্তে যে ফসল তাঁর নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী তাঁর কাছেই বিক্রি করতে হবে। বলা বাহুল্য সেই মূল্য বাজার দরের চেয়ে অনেক কম। (সুফিয়া বেগম তাঁর বাঁশের মোড়া দাদন পদ্ধতিতে পাইকারের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছিলেন।

