, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 29° সে. | 💧 আদ্রতা 81%

চট্টগ্রামে আট দিনে রেকর্ড বৃষ্টি, প্রকৃতি কি দিচ্ছে নতুন বার্তা?

নিজস্ব প্রতিবেদক

টানা আট দিনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিতে কার্যত বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম। জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধসের আশঙ্কা, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবং স্বাভাবিক জনজীবনে ব্যাপক দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। এমন দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাত শুধু একটি মৌসুমি ঘটনা নাকি এর পেছনে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত—এ প্রশ্ন এখন আলোচনায়।

আবহাওয়াবিদদের মতে, বঙ্গোপসাগরে বারবার সৃষ্টি হওয়া লঘুচাপ, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে নির্দিষ্ট সময়জুড়ে মাঝারি বৃষ্টি হতো, এখন স্বল্প সময়ে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে ৫ জুলাই চট্টগ্রামে ১৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। পরের দিন বৃষ্টি বেড়ে হয় ২৮৩ মিলিমিটার। ৭ জুলাই ২৮৪ মিলিমিটার, ৮ জুলাই ২৪৯ মিলিমিটার এবং ৯ জুলাই ২১১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। এরপর ১০ জুলাই ২৮ মিলিমিটার, ১১ জুলাই ৯৮ মিলিমিটার এবং ১২ জুলাই ১৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।

সব মিলিয়ে আট দিনে বৃষ্টির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৮২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশে ২৪ ঘণ্টায় ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিকে অতি ভারী বৃষ্টি ধরা হয়। সে হিসাবে চট্টগ্রাম আট দিনের মধ্যে সাত দিনই ছিল অতি ভারী বৃষ্টির মধ্যে।

এই আট দিনে বান্দরবানে মোট ১ হাজার ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজারে ৮৪৬ মিলিমিটার, সন্দ্বীপে ৭৬৮, সীতাকুণ্ডে ৬৭৬, রাঙামাটিতে ৬৪৬ এবং হাতিয়ায় ৫৮১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে এই সময়ে। কুতুবদিয়ায় সাত দিনের পাওয়া হিসাবে বৃষ্টির পরিমাণ ৯৯২ মিলিমিটার। সেখানে শুধু ৮ জুলাই এক দিনে বৃষ্টি হয়েছে ৩০০ মিলিমিটার।

চট্টগ্রাম নগরীর দীর্ঘমেয়াদি রেকর্ডে এর আগে বড় কয়েকটি বর্ষণ পর্ব ছিল। ১৯৫৫ সালের ১৪ জুলাই এক দিনে ৪১৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। ওই দফায় সাত থেকে আট দিনে মোট বৃষ্টি ছিল ৭৫৭ মিলিমিটার।

১৯৫৩ সালের ৪ জুলাই চট্টগ্রামে এক দিনে ৪০৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। ওই বর্ষণ পর্বে মোট বৃষ্টি হয়েছিল ৬৮৬ মিলিমিটার। ১৯৮৫ সালের জুলাইয়ের আরেকটি বড় বর্ষণ পর্বে মোট বৃষ্টি ছিল ৭৬৪ মিলিমিটার।

এবারের ১ হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টি চট্টগ্রামের আগের উল্লেখযোগ্য বর্ষণ পর্বগুলোর প্রায় দ্বিগুণ। ১৯৫৫ সালের তুলনায় এবার ৬৯৭ মিলিমিটার এবং ১৯৮৫ সালের তুলনায় প্রায় ৬৯০ মিলিমিটার বেশি বৃষ্টি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরায়ণ, পাহাড় কাটা, জলাধার ও খাল দখলের কারণে অতিবৃষ্টির প্রভাব আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ফলে অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, আর টানা বর্ষণে বাড়ছে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের ঝুঁকি।

পরিবেশবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় টেকসই নগর পরিকল্পনা, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত না হলে এমন চরম আবহাওয়া আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে।

এদিকে, আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। তাই পাহাড়ি এলাকা ও নিচু অঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইতি/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত