, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 25° সে. | 💧 আদ্রতা 96%

আফগানিস্তানে সোনার জোয়ার

নিজস্ব প্রতিবেদক

আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাদাখশান প্রদেশে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে সোনা উত্তোলনের কার্যক্রম। প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে চলছে ব্যাপক খনন। কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শ্রমিক ও বিনিয়োগকারীরাও এসব এলাকায় ছুটছেন

প্রাদেশিক রাজধানী ফয়জাবাদ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের শিওয়া এলাকায় বর্তমানে কয়েক হাজার শ্রমিক সোনা উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বাদাখশানে খনি কার্যক্রমের জন্য কয়েক শ কোম্পানি নিবন্ধিত হয়েছে। একই সঙ্গে অনেক ছোট পরিসরের খনিও পরিচালিত হচ্ছে।

তালেবান সরকার ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর দেশের খনিজসম্পদকে অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। সরকারি রাজস্ব বাড়ানো এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে খনি খাত সম্প্রসারণে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ।

বিশ্বব্যাংকের মে মাসের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর আফগানিস্তানে খনি খাতে শত শত চুক্তি হয়েছে। এ সময় খাতটির প্রকৃত প্রবৃদ্ধি বছরে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে ছিল।

খনন বাড়ায় সংকটে স্থানীয়রা

সোনা উত্তোলনের ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে কিছু কর্মসংস্থান তৈরি হলেও এর নেতিবাচক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নদী, কৃষিজমি ও পশুর চারণভূমির ওপর পড়ছে চাপ।

বাদাখশানের স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আমিনের জমি একটি খনি কোম্পানি ইজারা নিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী জমির জন্য ২০ হাজার মার্কিন ডলার পাওয়ার কথা থাকলেও তিনি এখন পর্যন্ত পেয়েছেন অর্ধেক অর্থ। খনন শেষে জমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়িত হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।

স্থানীয়দের ভাষ্য, পাহাড় কেটে মাটি সরানো এবং নদীর তীরবর্তী এলাকায় খননকাজের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক জায়গায় চারণভূমি নষ্ট হওয়ায় পশুপালন কঠিন হয়ে পড়েছে। ধুলাবালি ও মাটির স্তূপের কারণে কৃষিকাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বেকারত্বের মধ্যে নতুন কর্মসংস্থান

আফগানিস্তানের দুর্বল শ্রমবাজারে খনি খাত অনেকের জন্য আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। কাবুলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিকেরা বাদাখশানে এসে কাজ করছেন।

খনিতে ট্রাকে মালামাল ওঠানো-নামানোর কাজ করা এক তরুণ শ্রমিক জানান, রাজধানীতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় তিনি এই পেশাকে বেছে নিয়েছেন। অন্যদিকে, কিছু উদ্যোক্তা নিজস্ব খননযন্ত্র নিয়ে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে এসে খনির ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন।

তবে শ্রমিকদের আয় তুলনামূলক কম হওয়া এবং খনির নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

সরকারের নজরদারি ও রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা

আফগানিস্তানের খনি ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগের সময়ে অনেক এলাকায় যথাযথ তদারকি ছাড়াই খনিজ উত্তোলন করা হতো। বর্তমানে খনি খাতকে নিবন্ধন, কর ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, বাদাখশানের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের তাখারসহ অন্যান্য এলাকাতেও সোনা উত্তোলন বাড়ছে। কয়েকটি প্রকল্পে বিদেশি অংশীদারদেরও সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

বর্তমানে নিবন্ধিত খনি কোম্পানিগুলোর ওপর জমির পরিমাণ অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে কর আরোপ করা হয়েছে। কোম্পানির লাভ-লোকসানের বিষয়টি বিবেচনা না করেই এই কর পরিশোধের বিধান রয়েছে।

উৎপাদন বাড়লেও রয়েছে লোকসানের ঝুঁকি

বাদাখশানের একটি খনি প্রকল্পে প্রায় ১০০ শ্রমিক ও ২০টি খননযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রকল্পটির ব্যবস্থাপকের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে সপ্তাহে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম সোনা উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে। তবে যন্ত্রপাতি, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের কারণে প্রকল্পটি এখনো লাভজনক অবস্থায় পৌঁছায়নি।

প্রাদেশিক খনি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাদাখশান থেকে প্রায় ১১২ কেজি সোনা সংগ্রহ করেছে সরকার। তবে একই সময়ে বহু খনি নিবন্ধনের বাইরে থাকায় সেগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়নি।

পরিবেশ ও অবকাঠামোর ক্ষতির অভিযোগে প্রদেশটিতে প্রায় ২২৫টি খনি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শিওয়া এলাকার কয়েকটি খনিও রয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বনাম পরিবেশগত ঝুঁকি

আফগানিস্তানের সোনা উত্তোলন খাত বর্তমানে দেশটির অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সরকারি রাজস্ব, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় ব্যবসা সম্প্রসারণে খাতটি ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে , অপরিকল্পিত খনন অব্যাহত থাকলে কৃষিজমি, নদী, চারণভূমি ও স্থানীয় অবকাঠামোর ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করতে পারে। ফলে সোনা উত্তোলনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা, স্থানীয় জনগণের অধিকার এবং স্বচ্ছ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত