চট্টগ্রামে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে বদলেছে কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতাও। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে চলাফেরা করতে দেখা যেত, তাদের একটি অংশ এখন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতা-কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে নগরজুড়ে কিশোর অপরাধ, মাদক ব্যবসা, দখল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এর একটি উদাহরণ বাকলিয়ার মো. মুরাদ। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি নগর যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁকে যুবদলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখা যায়। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিতিতেও তিনি চান্দগাঁও থানা যুবদলের সংগঠক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তবে নগর যুবদল ও সংশ্লিষ্ট নেতা তাঁর সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
মুরাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও দখলসহ বিভিন্ন অপরাধে একাধিক মামলা রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বাকলিয়ায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় আলোচনায় আসেন তিনি। পরে ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে পটিয়া থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর আগের পৃষ্ঠপোষকদের অনেকে আত্মগোপনে গেলেও এসব গ্যাংয়ের কিছু সদস্য এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। তাদের একটি অংশ নতুন রাজনৈতিক যোগাযোগ তৈরি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের তথ্যমতে, নগরের অন্তত ৪৫টি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে। সাম্প্রতিক অপরাধের ঘটনায় এমবিএস, কেবি, এনএস, ৯৯৯, এক্স-মার্ক, ব্যাকহোল, ডট গ্যাং, বিঙ্গু, পাইথন, সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টারসহ কয়েকটি গ্রুপের নাম উঠে এসেছে।
গ্যাং সংঘর্ষে প্রাণহানি, বাড়ছে আতঙ্ক
কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে একাধিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে খুলশীর পাহাড়তলী ওয়্যারলেস কলোনিতে সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টার গ্রুপের বিরোধে ১৬ বছর বয়সী সবজি বিক্রেতা মো. হৃদয় নিহত হয়। ঘটনাটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত সাড়ে সাত বছরে চট্টগ্রাম নগরে অন্তত ৬৩৫টি অপরাধের ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার মধ্যে ৩৯টি হত্যাকাণ্ড।
মাদক ব্যবসায় ব্যবহারের অভিযোগ
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের মাদক বিক্রির এলাকা নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নগরের শতাধিক মাদক বিক্রির স্থানে কোনো না কোনোভাবে কিশোরদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
এ ছাড়া মাদকবিরোধী অভিযানের সময় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাতেও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। গত জুলাইয়ে ডবলমুরিংয়ের আমবাগানে মাদক মামলার আসামিকে ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হন পুলিশের এক উপপরিদর্শক। ওই ঘটনায় তিনি ছুরিকাঘাতে আহত হন।
পুরোনো মামলার বিচার নিয়ে উদ্বেগ
কিশোর অপরাধের পাশাপাশি এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচারপ্রক্রিয়াও দীর্ঘ হচ্ছে। আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে কিশোর অপরাধসংক্রান্ত ১ হাজার ৬২৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিত না হওয়াকে বিচার বিলম্বের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরীর মতে, শুধু কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। যারা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীও মনে করেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সহযোগিতা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় বা পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তন হলেও কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক তৎপরতা বন্ধ না হলে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। তাই অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের মদদদাতাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
ইতি/
