
মো. কামাল উদ্দিন:
আমি আজ দুটি হৃদয়বিদারক ঘটনা নিয়ে একটি পর্যালোচনামূলক লেখা লিখতে বসেছি। তবে আমার এই লেখা কোনো পক্ষপাতমূলক নয়; কেবল ঘটনাগুলিকে পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা মাত্র।এই আগস্ট মাসে দেশে এবং বাইরে বহু ঘটনার ইতিহাস রয়েছে। তবে আমাদের বাঙালি জাতির জন্য কলঙ্কিত, সংকটময় এবং স্মরণীয় দুঃখের মাস হলো এই আগস্ট মাস। এই মাসেই, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিলো, যার ইতিহাস আমরা সবাই জানি। আবার ইতিহাসের পাতায় আরেকটি ঘটনা সংযুক্ত হয়েছে, তা হলো ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে দেশত্যাগ করেছেন। এই দুটি ঘটনা নিয়ে আমার কিছু কথা। লেখার শুরুতেই আমি ১৫ই আগস্টের বঙ্গবন্ধুসহ সকল শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং সেই সঙ্গে ছাত্র জনতার আন্দোলনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদেরও আত্মার মাগফিরাত এবং স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল সম্মান জানাচ্ছি। এই সংকটময় মুহূর্তে আমি এই লেখাটি দেশ ও জাতির স্বার্থে উপস্থাপন করছি। এই দুটি ঘটনার থেকে আশা করি আমরা অনেক কিছু শিখতে পারব। চলুন বিস্তারিত আলোচনায় যাই। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়াটা, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের জন্য চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে দেশ পরিচালনা এবং দলের ভেতরে একতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। একজন রাজনৈতিক নেতার প্রস্থানের প্রেক্ষাপটে কীভাবে দল এগিয়ে যাবে এবং কীভাবে সাধারণ মানুষ ও কর্মীরা তাদের ভূমিকা পালন করবে, তা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। নোতা কর্মিদের করণীয়
একতা বজায় রাখা: শেখ হাসিনার প্রস্থানে দলের অভ্যন্তরে বিভাজন বা ভাঙনের সম্ভাবনা থাকে। দলীয় নেতাকর্মীদের একত্রিত থাকা এবং দলের আদর্শকে সমুন্নত রাখা এই সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। দলের ভেতরে যারা নেতৃত্বের প্রতি অনুগত এবং আদর্শিক, তাদের ঐক্য বজায় রেখে নেতৃত্বে শক্তি সঞ্চার করতে হবে।দলের নেতৃত্ব শক্তিশালী করা: শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্বের ওপর একটি বড় দায়িত্ব এসে পড়বে। নোতা কর্মিদের এই সময়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং শক্তিশালী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে, যাতে দল নিজেদের ভিতরে কোন বিশৃঙ্খলা তৈরি না করে। বিকল্প নেতৃত্বকে গড়ে তুলতে এবং তাদের প্রতি সমর্থন দিতে হবে।আন্দোলন ও সংহতির প্রচেষ্টা: শেখ হাসিনার প্রস্থান যদি কোনো রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে, তবে দলের কর্মীদের আন্দোলন এবং সংহতির মাধ্যমে জনগণকে সাথে নিয়ে চলতে হবে। নতুন নেতৃত্বকে মেনে নেওয়া এবং তাদের সিদ্ধান্তে আস্থা রাখতে হবে। আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পরিবর্তন শেখ হাসিনার প্রস্থানে আওয়ামী লীগকে নতুন নেতৃত্ব খুঁজতে হবে, যা দলের ভেতর এক বড় পরিবর্তন আনবে। দলটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তাদের নতুন নেতার দক্ষতা, আদর্শিক দৃঢ়তা এবং সংগঠনের প্রতি অবিচল থাকায়। দল যদি নিজেদের ভেতরে নেতৃত্ব নিয়ে কোনো সংঘাত সৃষ্টি করে, তবে এটি দলের জন্য ক্ষতিকর হবে।রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা:
আওয়ামী লীগের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামাল দেওয়া। বিরোধী দলগুলোর শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে, এবং তাদের প্রভাবিত করতে হবে যাতে দলীয় ভাঙন রোধ করা যায়। এই সময়ে সংগঠনকে শক্তিশালী রাখা, নীতিগত স্থিরতা বজায় রাখা, এবং জনসমর্থন ধরে রাখা হবে জরুরি। আদর্শিক স্থিতি:দলের আদর্শিক ভিত্তি ও লক্ষ্যকে পরিষ্কারভাবে পুনঃ সংজ্ঞায়িত করা হবে অপরিহার্য। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে দলকে সঠিক পথে চালিত করা এবং দলের মূল আদর্শের প্রতি অনুগত থেকে নতুন দিশা দেখানো হবে গুরুত্বপূর্ণ।শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের বিশ্লেষণঅপ্রত্যাশিত সংকট:
যদি শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যান, তবে এটি স্পষ্ট যে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছিল। হয়তো দলীয় ভেতরে অস্থিরতা, রাজনৈতিক চাপ, অথবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে এও বলা যেতে পারে যে, তিনি দেশের স্বার্থে এবং দলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যদিও এটি দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য একটি কঠিন সময় তৈরি করেছে।ভুল সিদ্ধান্ত ও দুরদর্শিতার অভাব: শেখ হাসিনার এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে ভুল মনে হতে পারে, বিশেষ করে যারা তার নেতৃত্বে আস্থা রেখেছিল। তার দেশত্যাগে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হবে, তা দল ও দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত দুরদর্শিতার অভাবকেও নির্দেশ করতে পারে, কারণ একটি নেতৃত্ব যখন তার দায়িত্বের কেন্দ্র থেকে সরে যায়, তখন দল ও দেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে।সমাপ্তি: এক ধোঁয়াশার মধ্যে দিশা খোঁজাএকজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা শেখ হাসিনার প্রস্থানে দলের ভেতর অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা দেখতে পাই। দলটির সদস্যদের জন্য এটি এক অগ্নিপরীক্ষার সময় হবে। একদিকে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে হবে, অন্যদিকে নতুন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে দলকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে যারা নেতৃত্বে আসবেন, তাদেরকে দলের ঐতিহ্য এবং আদর্শিক ভিত্তির প্রতি অনুগত থাকতে হবে এবং জনগণের সমর্থন ধরে রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তাদের সক্ষমতা এবং কৌশলগত দক্ষতার উপর, যা এই সংকট মোকাবিলা করতে পারে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা শুধু প্রার্থনা করতে পারি যে, বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ফিরে আসবে, এবং যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, তারা দেশের উন্নয়ন এবং জনগণের কল্যাণে সর্বদা কাজ করে যাবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড এবং শেখ হাসিনার দেশত্যাগ—এই দুই ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এদের মধ্যে পার্থক্য বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নয়, বরং ব্যক্তিগত বেদনা, জাতিগত অবমাননা, এবং বাঙালি জাতির সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসকেও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে।বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড: এক অসমাপ্ত বিপ্লবের নির্মম সমাপ্তি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাত্রি, যখন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, তখন গোটা দেশ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু, যিনি তাঁর জীবনের সমস্ত শক্তি এবং আত্মত্যাগ দিয়ে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ গড়েছিলেন, তাঁর নিজের দেশেই প্রতারিত হয়ে গেলেন। একজন মহান নেতা, যিনি বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক ছিলেন, তাঁর এমন নির্মম পরিণতি আমাদের মনে একটি চিরস্থায়ী ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে বঙ্গবন্ধুর হত্যার কারণ একাধিক হতে পারে—শক্তির লোভ, প্রতিহিংসা, অথবা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। কিন্তু যাই হোক না কেন, এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশব্যাপী এক গভীর বেদনা ও হতাশা সৃষ্টি হয়। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন, কারণ ষড়যন্ত্রকারীরা চেয়েছিল এই পরিবারকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দিতে, যেন তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কেউ আর বহন করতে না পারে। বঙ্গবন্ধুর প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ যেন তাঁর আত্মাকে হারিয়ে ফেলে, এবং দেশে একটি দীর্ঘ সময় ধরে অন্ধকারের প্রভাব পড়ে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগ: এক আশ্রয় খোঁজার কাহিনী বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর, তার কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেই সময়ে বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু তাদের জীবনে নেমে আসে এক দুর্বিষহ কালো ছায়া। তারা বিদেশে নির্বাসিত জীবনযাপন করতে বাধ্য হন, কারণ দেশে ফিরে আসার উপায় ছিল না। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্য হিসেবে তারা নিজের দেশেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ফিরে আসেন, কিন্তু তার পূর্বে তার দেশত্যাগ ছিল একটি বাধ্যতামূলক পরিস্থিতি। এটি ছিল তার জন্য শুধু একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং একটি আত্মরক্ষামূলক চর্চা। তাঁর সেই সময়ে দেশে ফিরে আসার কোনো পরিস্থিতি ছিল না, এবং শত্রুরা চেয়েছিল তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে চিরতরে দূরে রাখতে।একটি সাধারণ মানুষের মূল্যায়নএকজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড এবং শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মধ্যে পার্থক্য হল, একটিতে একটি মুক্তিযুদ্ধের নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, এবং অন্যটিতে তার উত্তরাধিকারকে জীবিত রাখতে নির্বাসন নেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্যে একটি নির্মম বাস্তবতা ছিল, যেখানে একটি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ নেতাকে তাঁর নিজের দেশের মাটিতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার দেশত্যাগ ছিল এক প্রকার আত্মরক্ষার উপায়, যা তাকে এবং তার পরিবারের জীবিত থাকার একটি সুযোগ দেন এটি শুধু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নয়, বরং বাঙালি জাতির আত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঘটনার সাক্ষ্য দেয়। বঙ্গবন্ধু যদি তাঁর জীবন দিয়ে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দেন, তবে শেখ হাসিনা তাঁর বুদ্ধিমত্তা এবং ধৈর্য দিয়ে সেই বাংলাদেশের রাজনীতিকে পুনর্গঠিত করেছেন। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, আমরা এই দুই ঘটনার মধ্যে যে গভীর বেদনা ও বিচ্ছিন্নতা অনুভব করি, তা আমাদের মনে একটি স্থায়ী ছাপ ফেলে যায়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড আমাদের শেখায় যে স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের প্রয়োজন এবং শেখ হাসিনার দেশত্যাগ আমাদের শেখায় যে, কখনও কখনও বেঁচে থাকা এবং সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ। তারা দুজনই বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি বিশেষ জায়গা অধিকার করে রেখেছেন, এবং তাদের এই দুঃখময় গাঁথা আমাদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের হত্যাকাণ্ডের পর, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া এবং ভূমিকা ছিল জটিল এবং বহুমাত্রিক। এই হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী ঘটনাবলী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, এবং দেশের পরিস্থিতি এক অস্থিরতার দিকে ধাবিত হয়।রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা আওয়ামী লীগ:
আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত দল, ছিল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। দলটির প্রধান নেতা এবং অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর দলের নেতাকর্মীরা এক ধরনের ধাক্কা খায় এবং বেশিরভাগই আতঙ্কের মধ্যে চলে যায়। সেই সময়ে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়ে এবং অনেক নেতা গোপনে চলে যান বা নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েন। সামরিক বাহিনীর তীব্র নজরদারির কারণে আওয়ামী লীগ কোনো প্রতিবাদ বা সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। পরে ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটি নতুন করে সংগঠিত হয় অন্যান্য রাজনৈতিক দল: বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এবং অন্যান্য দলগুলোও তাদের অবস্থান নিয়ে সংকটে পড়ে। সামরিক শাসনের অধীনে এই দলগুলো মূলত নিরব ছিল, এবং অনেক দল সামরিক সরকারের সঙ্গে সহযোগিতায় যায়। কিছু দল এবং নেতৃবৃন্দ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা করেন। জাসদ বা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ১৯৭৫ সালের পূর্বে অনেক সক্রিয় ছিল, কিন্তু হত্যাকাণ্ডের পর এই দলটিও নিরব হয়ে পড়ে। সামরিক শাসনের কঠোরতা এবং দমননীতি কার্যকর হওয়ার কারণে জাসদসহ অন্যান্য প্রগতিশীল দলগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রম অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়।সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াবআতঙ্ক ও বিভ্রান্তি:সাধারণ মানুষ এই হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে গভীর শোকে ডুবে যায়। বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা ছিল দেশজুড়ে, এবং তার হত্যাকাণ্ডে মানুষ হতবাক হয়ে পড়ে। সেই সময়কার সামরিক সরকারের কঠোর সেন্সরশিপ এবং নিয়ন্ত্রণের কারণে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি এবং আতঙ্ক তৈরি হয়। ঘটনার প্রকৃত তথ্য জানা সম্ভব ছিল না এবং যে কোনো প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ প্রচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হয়।প্রতিবাদ ও আন্দোলন:
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরপরই কোনো বড় ধরনের প্রতিবাদ বা আন্দোলন দেখা যায়নি। সামরিক বাহিনী এবং তাদের সমর্থকদের দমনপীড়নের কারণে রাজপথে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষুদ্র প্রতিবাদ সংগঠিত হয় এবং কিছু জায়গায় সাধারণ মানুষ নিজেদের শোক প্রকাশ করতে চেয়েছিল, তবে তাও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।তখনকার দেশের পরিস্থিতি সামরিক শাসনের উত্থান:
বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং তার সমর্থিত সামরিক বাহিনী দ্রুত ক্ষমতা দখল করে। সামরিক শাসন জারি হয় এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় দমনপীড়ন চালানো হয়। রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়। বিশ্বপর্যায়ে প্রতিক্রিয়া:
আন্তর্জাতিকভাবে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডটি বাংলাদেশ এবং বাইরের অনেক দেশেই নিন্দিত হয়। তবে, তখনকার বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে কোনো দেশের তরফ থেকে উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করা হয়নি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি তখন খুবই অনিশ্চিত এবং অস্থিতিশীল ছিল।অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি:এই অস্থিরতার মধ্যেও দেশের অর্থনীতি ও সমাজজীবনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে। মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। নতুন শাসকেরা তাদের নিজেদের স্বার্থে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকে নিজেদের মতো করে গড়ে তুলতে চেষ্টা করে।পরিণতি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর দেশ কার্যত এক ধরনের অস্থিরতার মধ্যে পড়ে এবং সেই সময়ে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নতুন করে গড়ে ওঠে। সামরিক শাসনের অধীনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। এই হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সময়ে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ এবং প্রতিবাদ প্রকাশিত হয়, যা পরে বিভিন্ন আন্দোলনের মাধ্যমে পরিণতি লাভ করে। এই পুরো প্রেক্ষাপটটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা আজও গভীরভাবে অনুভূত হয় এবং আলোচনা করা হয়। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত। এই ঘটনার পর সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের ভূমিকা ছিলো বিভিন্ন মাত্রায় ভিন্ন। নিম্নে সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো: হত্যাকাণ্ডের পর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া
১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর, সামরিক বাহিনীর একটি অংশের নেতৃত্বে ঘটে এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ। সেই সময়ে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের উপর প্রচণ্ড চাপ ও শাসন চাপিয়ে দেওয়া হয়। প্রথমত, ঘটনার পর পরই, সামরিক সরকার দেশের প্রচার মাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। সেন্সরশিপ এবং সেনাবাহিনীর প্রভাবে অধিকাংশ পত্রিকা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ন্যূনতম তথ্য প্রকাশ করে। সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও সংবাদ পরিবেশনা
হত্যাকাণ্ডের পর, সাংবাদিকরা কার্যত এক ধরনের অচলায়তনে পড়ে যায়। সংবাদপত্রগুলোতে তখনকার সামরিক সরকারের প্রভাব ছিল এতটাই ব্যাপক যে, তারা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত তথ্য, বা সেই হত্যাকাণ্ডের পিছনের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে কিছু প্রকাশ করতে পারেনি। এই সময় সংবাদপত্রের সম্পাদকরা প্রায়ই সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতে বাধ্য হন এবং সরকারের দেওয়া বিবৃতি বা নির্দেশ মেনে চলতে হয়। সেসময়কার সংবাদপত্রের পরিবেশনা বাংলাদেশের প্রধান সংবাদপত্রগুলো যেমন ‘দৈনিক ইত্তেফাক,’ ‘দৈনিক বাংলার বাণী’ এবং ‘দৈনিক সংবাদ’ সেই সময়ে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে নিরপেক্ষ বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেনি। সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত এই সংবাদপত্রগুলো সামরিক সরকারের প্রচার কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠে। এই সংবাদপত্রগুলোতে সেসময়কার সরকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে যতটা না সত্য বলা হয়, তার চেয়ে বেশি মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য প্রকাশিত হতো ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর
তবে, এই কঠোর পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু ব্যতিক্রমী সাংবাদিক ও সম্পাদক ছিলেন যারা নিজেদের মতামত প্রকাশের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাদের সেই প্রচেষ্টা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দমন করা হয়েছে, এবং অনেকেই পেশাগত ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। সাংবাদিকদের অনেকে তীব্র চাপের মুখেও তাদের আদর্শ ও নৈতিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন, যদিও তাদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। প্রভাব এবং পরিণতি
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর সংবাদপত্রের ভূমিকা সমাজের উপরে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। জনগণের মধ্যে তথ্যের অধিকার হরণ করা হয় এবং এই সময়কালটি বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়। সংবাদপত্রগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ ও সেন্সরশিপ দীর্ঘস্থায়ী হয়, যা পরবর্তীতে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। এই পুরো সময়কালটি বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য একটি পরীক্ষার সময় ছিল। যদিও বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম তখনকার শাসকগোষ্ঠীর হাতের পুতুলে পরিণত হয়, কিন্তু কিছু ব্যতিক্রমী সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম চেষ্টা করেছেন নিজেদের আদর্শ ও নীতি বজায় রাখার জন্য, যা ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে।

