জাতীয় গ্রিডের ওপর বিদ্যুতের চাপ কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সরকার। নতুন এ উদ্যোগের আওতায় বাড়ি, বাণিজ্যিক ভবন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে নিজেদের চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিটের বিপরীতে ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়া যাবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়া বিশেষ প্রণোদনা অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। এ সুবিধার আওতায় সরবরাহ করা বিদ্যুতের জন্য ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারিত মূল্য পাওয়া যাবে।
যেভাবে নির্ধারণ হলো বিদ্যুতের দাম
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সর্বোচ্চ ব্যয় প্রতি ইউনিট ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যুক্ত করে গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা।
অর্থাৎ, গ্রাহক নিজের ব্যবহারের পর যে পরিমাণ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন, সেই পরিমাণের ভিত্তিতেই অর্থ পাবেন। সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা উৎপাদন ও সরবরাহের হিসাব সংরক্ষণ করবে। নির্ধারিত অর্থ গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব অথবা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে।
ব্যাটারি স্থাপন বাধ্যতামূলক
বিশেষ প্রণোদনার আওতায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে ব্যাটারি সংযুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, মিটার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নির্ধারিত কারিগরি মান পূরণ করতে হবে।
ব্যাটারি ব্যবহারের ফলে দিনের বেলায় উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে সন্ধ্যার চাহিদা বেশি থাকার সময়, সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যাবে। এতে গ্রাহকের নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগও বাড়বে।
তবে নির্ধারিত সময়সীমার আগে স্থাপিত পুরোনো সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নতুন এ বিশেষ প্রণোদনা প্রযোজ্য হবে না। সুবিধা পেতে নতুন ব্যবস্থার নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে।
চট্টগ্রামে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা
গ্যাসের স্বল্পতা ও বিকল্প বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে চট্টগ্রামের আবাসিক এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। রান্নার গ্যাসের সংকটে অনেক পরিবার রাইস কুকার, ইন্ডাকশন চুলা ও ইলেকট্রিক কুকারের ওপর নির্ভর করছে। এতে বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের ব্যবহার আরও বাড়ছে।
অন্যদিকে, গ্যাস সরবরাহের সীমাবদ্ধতায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনেও চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে চাহিদা বৃদ্ধি ও উৎপাদনসংকট একসঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
পিডিবির দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। তাঁর মতে, রান্নার কাজে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার বাড়লে কোনো এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যেতে পারে।
শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ সচল রাখার উদ্যোগ
চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চল হওয়ায় শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে প্রয়োজন অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সমন্বয় করা হচ্ছে। এর ফলে কিছু এলাকায় লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি বাড়ছে।
বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ কমানোর প্রত্যাশা
বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয়ব্যয়ের তুলনায় গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রয়মূল্য কম হওয়ায় সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। পিডিবির দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলীর তথ্যমতে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে প্রায় ১২ টাকা ৫০ পয়সা ব্যয় হলেও গ্রাহক পর্যায়ে তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৮ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৯ টাকায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণ করা গেলে প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ ও বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কমাতেও দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে এ উদ্যোগ।
সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করা। নতুন প্রণোদনা কর্মসূচিকে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইতি/
