কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। রানওয়ে সম্প্রসারণ, নতুন যাত্রী টার্মিনাল, আধুনিক আলোকব্যবস্থা ও উড়োজাহাজ পার্কিং সুবিধাসহ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বেশ কিছু অবকাঠামো ইতোমধ্যে প্রস্তুত। চলতি অক্টোবরেই আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সমুদ্রের দিকে ১ হাজার ৭০০ ফুট সম্প্রসারণের পর রানওয়ের দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৭০০ ফুটে। এর ফলে বড় আকারের উড়োজাহাজ ওঠানামার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর নতুন রানওয়েতে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি বেসরকারি এয়ারলাইনসের ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়।
রানওয়েতে ক্যাটাগরি-২ এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। কম দৃশ্যমানতা ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় উড়োজাহাজ ওঠানামায় এটি সহায়তা করবে। সমুদ্রের দিকে ২ হাজার ২০০ ফুট দীর্ঘ প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইটও স্থাপন করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি মোকাবিলায় সমুদ্রতীরে রক্ষাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য নতুন টার্মিনাল
প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার আয়তনের নতুন টার্মিনাল ভবনে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে। বহির্গমন লাউঞ্জে একসঙ্গে প্রায় ৪৫০ জন যাত্রীর অবস্থানের সুযোগ রয়েছে।
টার্মিনালে থাকছে বোর্ডিং ব্রিজ, লিফট, এসকেলেটর, কনভেয়ার বেল্ট, আগমন ও বহির্গমন ইমিগ্রেশন কাউন্টার এবং আগমনী লাউঞ্জ। পাশাপাশি ডিউটি-ফ্রি শপ, সিসিটিভি, লাগেজ স্ক্যানিং, ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে ও ঘোষণা ব্যবস্থার সুবিধাও থাকছে।
একসঙ্গে পার্ক করা যাবে পাঁচ উড়োজাহাজ
বিমানবন্দরের প্রায় ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটার অ্যাপ্রোনে দুটি বড় আকারের উড়োজাহাজসহ মোট পাঁচটি উড়োজাহাজ পার্ক করার ব্যবস্থা রয়েছে। রানওয়ে ও পার্কিং এলাকার মধ্যে যোগাযোগের জন্য দুটি ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।
টার্মিনালের সামনে ৩৫টি ভিআইপি এবং ৯০টি সাধারণ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।
কিছু কাজ এখনো চলমান
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট পর্যন্ত বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং রানওয়ে উন্নয়নকাজের অগ্রগতি ৯১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। তবে রানওয়ের নিরাপত্তা সীমানাপ্রাচীর, টহল সড়ক ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার কিছু কাজ এখনো চলছে।
বড় এভিয়েশন হাবের পরিকল্পনা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি
কক্সবাজারকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে তৃতীয় একটি বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় প্রায় ৬৮২ একর জমিতে নতুন যাত্রী টার্মিনাল, নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার, প্রশাসনিক ভবন, কার্গো কমপ্লেক্স, বিজনেস সেন্টার, এভিয়েশন ট্রেনিং সেন্টার, কোয়ারেন্টাইন হাসপাতাল, সমান্তরাল ট্যাক্সিওয়ে ও রিফুয়েলিং সুবিধা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি। বর্তমানে নকশা ও সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। এই পর্যায়ের অগ্রগতি প্রায় ৫৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। কাজ শেষ হলে নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের চাহিদাই বড় চ্যালেঞ্জ
অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এগোলেও কক্সবাজার থেকে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিদেশি কোনো এয়ারলাইনস এখন পর্যন্ত কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার সূচি ঘোষণা করেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু রানওয়ে ও টার্মিনাল তৈরি করলেই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সফল হবে না। প্রয়োজন পর্যাপ্ত যাত্রী, বিমান সংস্থাগুলোর বাণিজ্যিক আগ্রহ, পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং নিয়মিত ফ্লাইটের চাহিদা।
কক্সবাজারকে ভবিষ্যতে বিকল্প আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত (এমআরও) এবং পাইলট প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়নে নেওয়া তিনটি প্রকল্পে মোট ব্যয় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এই বিনিয়োগের সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংখ্যা, বিমান সংস্থার অংশগ্রহণ এবং নিয়মিত যাত্রী চাহিদা তৈরির ওপর।
ইতি/
