চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার ফল পরিবর্তনের অভিযোগে কম্পিউটার শাখার তিন অস্থায়ী কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার এক শিক্ষার্থীর ফল পুনঃনিরীক্ষণের সময় উত্তরপত্রের নম্বরের সঙ্গে কম্পিউটার সিস্টেমে সংরক্ষিত তথ্যের বড় ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়।
ঘটনাটি সামনে আসে গত ২৫ আগস্ট পুনঃনিরীক্ষণ কার্যক্রমের সময়। ওই শিক্ষার্থীর পদার্থবিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ছিল। যাচাইয়ের একপর্যায়ে দেখা যায়, উত্তরপত্রে যে নম্বর ছিল, প্রকাশিত ফলে তার চেয়ে বেশি নম্বর দেখানো হয়েছে।
সবচেয়ে বড় অমিল পাওয়া যায় পদার্থবিজ্ঞানে। উত্তরপত্রের সংশ্লিষ্ট অংশে কোনো নম্বর না থাকলেও কম্পিউটার সিস্টেমে সেখানে ৪৫ নম্বর দেখানো হয়। পরে শিক্ষার্থীর অন্যান্য উত্তরপত্রের নম্বরের সঙ্গেও সিস্টেমে থাকা তথ্যের অমিল পাওয়া যায়। বিষয়টি নিয়ে বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হলে তদন্ত শুরু করা হয়।
এ ঘটনায় স্ক্যানিং শাখার রাশেদুল ইসলাম নাসির ও ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী এবং সলভিং শাখার মো. রায়হানের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার পর ২৫ আগস্ট চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ হয়নি। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও বোর্ড সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন জানিয়েছেন, তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সংশ্লিষ্ট সময়ে কোন কর্মী কোন মেশিনে দায়িত্ব পালন করেছেন, তা জানতে সিস্টেমের তথ্য, স্ক্যানিং মেশিনের রেকর্ড এবং কর্মীদের দায়িত্বসূচি পর্যালোচনা করা হয়েছে। কারিগরি বিষয়গুলো যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও নেওয়া হয়েছে।
তবে অভিযুক্ত তিন কর্মীই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, স্ক্যানিং, বাছাই কিংবা সলভিংয়ের প্রক্রিয়ায় কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র আলাদাভাবে শনাক্ত করে তাতে পরিবর্তন আনার সুযোগ তাদের নেই।
দীর্ঘদিন একই কর্মীদের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন
ফল প্রস্তুতের মতো স্পর্শকাতর কাজে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মীদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অভিযুক্ত তিন কর্মীর মধ্যে দুজন ২০১৪ সাল থেকে বোর্ডের কম্পিউটার শাখায় কাজ করছেন। অন্যজন ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী যোগ দেন ২০২২ সালে। অর্থাৎ অভিযুক্তদের মধ্যে দুজন এক দশকের বেশি সময় ধরে এবং একজন প্রায় চার বছর ধরে সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত।
অন্য কয়েকটি শিক্ষা বোর্ডে এ ধরনের সংবেদনশীল দায়িত্বে থাকা কর্মীদের ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে পরিবর্তনের চর্চা থাকলেও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে দীর্ঘ সময় একই কর্মীদের দায়িত্ব পালনের অভিযোগ রয়েছে।
বোর্ডের কম্পিউটার শাখায় মোট ১৮ জন কর্মী রয়েছেন। তাদের মধ্যে চিফ প্রোগ্রামার ও একজন সহকারী প্রোগ্রামার স্থায়ী কর্মী। বাকি ১৬ জন দৈনিক মজুরিভিত্তিক। এদের মধ্যে সাতজন ২০১০ সাল থেকে ওই শাখায় কাজ করছেন।
এদিকে বোর্ডে সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্টের পদ খালি থাকায় কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট বিকাশ চন্দ্র মল্লিক ফল প্রস্তুতের কাজে সহায়তা করছেন।
তার মতে, ফল তৈরির সফটওয়্যারে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও অ্যাকসেস কন্ট্রোল না থাকলে অননুমোদিতভাবে তথ্য পরিবর্তনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কোন কর্মী কোন তথ্য দেখতে বা সম্পাদনা করতে পারবেন—এ বিষয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি।
আগেও উঠেছে ফল পরিবর্তনের অভিযোগ
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ফলাফল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার পুনঃনিরীক্ষণের সময় ৩৪টি উত্তরপত্রে প্রকৃত নম্বরের তুলনায় বেশি নম্বর সিস্টেমে প্রবেশ করানোর ঘটনা শনাক্ত হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়ে কিছু সুপারিশ পাঠানো হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও ১৭ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন—এমন অভিযোগের পর তাদের ফল বাতিল করা হয়।
২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল নিয়েও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তদন্তে তৎকালীন বোর্ড সচিব নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলে নক্ষত্র দেবনাথের একাধিক বিষয়ের নম্বর বাড়ানোর অভিযোগ উঠে আসে। পরে তার ফল বাতিল করা হয় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাসহ অতীতের এসব অভিযোগের কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ফল প্রস্তুত ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার নিরাপত্তা, কর্মীদের দায়িত্ব বণ্টন এবং নজরদারি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সর্বশেষ ঘটনায় প্রকৃতভাবে কারা জড়িত এবং কীভাবে সিস্টেমে নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছিল, তা তদন্ত শেষ হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে।
ইতি/
