, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 31° সে. | 💧 আদ্রতা 63%

ভাঙনে বদলে যাচ্ছে কক্সবাজার সৈকত

নিজস্ব প্রতিবেদক

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এর বিস্তৃত বালুচর। তবে কয়েক বছর ধরে সৈকতের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র ভাঙনে সেই বালুচর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। কোথাও সৃষ্টি হয়েছে গভীর গর্ত ও খালের মতো জলধারা, আবার কোথাও ঢেউ সরাসরি আঘাত করছে জিও ব্যাগের প্রতিরক্ষা বাঁধে। ভাঙনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ও ঝাউগাছও।

সাম্প্রতিক সরেজমিন পর্যবেক্ষণে লাবণী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সৈকতের বিভিন্ন অংশে ভাঙনের চিত্র দেখা গেছে। কয়েকটি স্থানে জিও ব্যাগ ছিঁড়ে বালু বেরিয়ে গেছে। কোথাও আবার নিচের বালু সরে গিয়ে বাঁধের নিচে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে। বালুচরের কিছু অংশ কেটে দীর্ঘ জলধারার মতো আকৃতিও নিয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশার মতে, জোয়ারের প্রবল ধাক্কায় বিভিন্ন স্থানে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে শুধু জিও ব্যাগের ওপর নির্ভর করে সৈকত রক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি পুনর্গঠনে সাগরলতা, নিশিন্দাসহ উপকূলীয় উদ্ভিদ ব্যবহার করা যেতে পারে। শক্তিশালী বালিয়াড়ি ঢেউয়ের আঘাত মোকাবিলায় প্রাকৃতিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে।

পাঁচ বছরে বদলে গেছে বালুচরের চেহারা

স্থানীয় ব্যবসায়ী মফিজুর রহমানের দাবি, গত পাঁচ বছরে লাবণী পয়েন্টের একটি অংশে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট বালুচর সাগরে বিলীন হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, কয়েক দশক আগেও বর্তমান সৈকত এলাকার আরও ভেতরে পর্যটকদের বসার জন্য চেয়ার-ছাতা বসানো হতো। এখন সমুদ্রের পানি ধীরে ধীরে স্থলভাগের দিকে এগিয়ে আসছে।

কক্সবাজার কিটকট ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমান জানান, লাবণী, কলাতলী ও সি-গাল পয়েন্টের কয়েকটি অংশে বালুচর ক্ষয়ে গর্ত তৈরি হয়েছে। এতে পর্যটকদের হাঁটা ও সমুদ্রে নামার জায়গাও কিছু এলাকায় কমে এসেছে।

পর্যটকদের ভোগান্তি বাড়ছে

লাবণী পয়েন্টে ভাটার সময় সৈকতের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও দীর্ঘ খালের মতো জলধারা দেখা যায়। এসব পার হয়েই পর্যটকদের সমুদ্রের পানির কাছে যেতে হচ্ছে। কয়েকটি স্থানে জিও ব্যাগের বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বালু বেরিয়ে পড়েছে।

সৈকতে দায়িত্ব পালনকারী লাইফগার্ড কর্মীদের ভাষ্য, লাবণী থেকে ডায়াবেটিকস পয়েন্টের দিকে জিও ব্যাগ বসানোর পরও কয়েকটি এলাকায় ভাঙন থামেনি; বরং নতুন করে ক্ষয়ের চিহ্ন দেখা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বালুচর ও বালিয়াড়ি ক্ষয়ের কারণে ঝাউগাছও একের পর এক সাগরে পড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটকদের চলাচলের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

 

পর্যটকদের মধ্যেও এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে সৈকতে হাঁটার সময় বালুচরের গর্ত এবং ছড়িয়ে থাকা জিও ব্যাগের কারণে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে বলে কয়েকজন পর্যটক জানিয়েছেন।

গবেষণায় উঠে এসেছে বড় ধরনের ক্ষয়ের চিত্র

কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১৯৮৯ থেকে ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, এই ৩৫ বছরে উপকূলের প্রায় ১ হাজার ৮৫ হেক্টর ভূমি ক্ষয় হয়েছে। বিপরীতে পলি জমে নতুন ভূমি তৈরি হয়েছে প্রায় ২৮৪ হেক্টর। অর্থাৎ ভূমি সৃষ্টির তুলনায় ক্ষয়ের পরিমাণ প্রায় চার গুণ বেশি।

গবেষণাটিতে উপকূলীয় ভাঙনের পেছনে ঢেউ, সাগরের স্রোত, জোয়ার, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পরিবর্তন, জলবায়ুগত পরিবর্তন, উপকূলের ভূ-আকৃতি এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কক্সবাজার ও মহেশখালী এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার নিয়েও বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগের বিষয় উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় ভাঙনকে শুধু প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি উপকূলে মানুষের হস্তক্ষেপও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

শুধু জিও ব্যাগে স্থায়ী সমাধান নয়

বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণেও অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, উচ্চ জোয়ার, ঢেউ এবং প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ক্ষয়ের মতো বিষয়গুলো কক্সবাজার উপকূলের ভাঙনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উঠে এসেছে।

সমুদ্রবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘ সৈকতের সব অংশে একই ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর নাও হতে পারে। তাই ভাঙনপ্রবণ এলাকার প্রকৃতি বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি সংরক্ষণ, সৈকতে বালি পুনঃস্থাপন বা ‘বিচ নরিশমেন্ট’, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকৌশলগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা গবেষণায় উঠে এসেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও প্রাকৃতিক বালিয়াড়িকে উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনার কথা বলেছেন। তাঁদের মতে, উপকূলীয় উদ্ভিদ রোপণ ও বালিয়াড়ি পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করা যেতে পারে।

এদিকে সৈকতের জিও ব্যাগের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও টেকসই করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সম্প্রতি কক্সবাজার সৈকতের বালিয়াড়ি ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সৈকতের একটি অংশে সড়ক নির্মাণ নিয়ে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা এবং পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগে সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকার ঘটনাও উপকূলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের গুরুত্বকে সামনে এনেছে।

সব মিলিয়ে কক্সবাজার সৈকতের ভাঙন এখন শুধু পর্যটনসংশ্লিষ্ট সমস্যা নয়; এর সঙ্গে উপকূলের পরিবেশ, প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি, জীববৈচিত্র্য এবং দীর্ঘমেয়াদি উপকূল ব্যবস্থাপনার বিষয়ও জড়িয়ে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই সমাধানের জন্য নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও সমন্বিত উপকূল ব্যবস্থাপনা জরুরি।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত