চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আমদানি পণ্য খালাসে লাইটারেজ জাহাজের সংকট দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত জাহাজ না পাওয়ায় বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য নিয়ে একাধিক মাদার ভ্যাসেলকে দীর্ঘ সময় সাগরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে আমদানিকারকদের বাড়তি ব্যয় গুনতে হচ্ছে এবং পণ্য সরবরাহেও ধীরগতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের অভিযোগ, লাইটারেজ জাহাজ পরিচালনায় চালু থাকা সিরিয়াল ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। তাদের দাবি, কিছু জাহাজ সিরিয়ালের বাইরে পণ্য পরিবহন করায় নির্ধারিত ব্যবস্থার আওতায় থাকা জাহাজের সংকট তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তারা।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বড় আকৃতির মাদার ভ্যাসেল থেকে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য স্থানান্তর করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। কয়লা, ক্লিংকার, স্ক্র্যাপ, গম, ডাল, সার, লবণ, পাথর, স্টিলসহ শিল্পের বিভিন্ন কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য এ নৌপথে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পৌঁছায়। গভীরতার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরের জেটিতে প্রবেশ করতে না পারায় বহির্নোঙরে লাইটারিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি মাদার ভ্যাসেলের পণ্য দ্রুত খালাস করা সম্ভব না হলে জাহাজটির অবস্থানকাল বেড়ে যায়। এতে বিদেশি জাহাজ মালিককে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমদানিকারকের ব্যয় এবং পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়তে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে বিপুল পরিমাণ আমদানি পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লাইটার জাহাজে পরিবহন করা হয়। আগে প্রকাশিত বন্দর-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বহির্নোঙর দিয়ে ৭ কোটি ১৩ লাখ টন পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছিল। কনটেইনারবিহীন আমদানি পণ্যের বড় একটি অংশও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে খালাস করা হয়।
বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে সিরিয়ালবিহীন জাহাজ চলাচলের অভিযোগ সামনে এসেছে। বিডব্লিউটিসিসির কনভেনর হাজী সফিক আহমেদ জানিয়েছেন, ৪০০-এর বেশি লাইটারেজ জাহাজ সিরিয়াল ব্যবস্থা অনুসরণ না করে পণ্য পরিবহন করছে। তাদের সিরিয়ালের আওতায় আনার চেষ্টা করা হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।
এর ফলে চাহিদা অনুযায়ী লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি মাদার ভ্যাসেলের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় কমসংখ্যক লাইটারেজ জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কয়েক ঘণ্টায় একটি লাইটারেজ জাহাজ পণ্য নিয়ে চলে যাওয়ার পরও মাদার ভ্যাসেলকে পরবর্তী জাহাজের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
আমদানিকারকদের অভিযোগ, এতে কিছু মাদার ভ্যাসেলকে দিনের পর দিন বহির্নোঙরে অবস্থান করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় জাহাজ আটকে থাকলে ডেমারেজ বা বিলম্বজনিত অতিরিক্ত খরচ বাড়ে। চলতি বছরের আগের এক সংকটেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন, লাইটারেজ জাহাজের সমস্যার কারণে প্রতিটি মাদার ভ্যাসেলের জন্য প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছিল।
তবে লাইটারেজ জাহাজের সংকটের পেছনে শুধু সিরিয়াল ব্যবস্থাকেই দায়ী করা হচ্ছে না। লাইটার জাহাজে পণ্য নেওয়ার পর আমদানিকারকদের কেউ কেউ সময়মতো পণ্য খালাস না করায় জাহাজ দীর্ঘদিন আটকে থাকার অভিযোগও রয়েছে। বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও এ ধরনের সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, লাইটারেজ জাহাজের সরবরাহ, সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা এবং পণ্য খালাস—এই তিনটি ক্ষেত্রে সমন্বয় না হলে বহির্নোঙরে মাদার ভ্যাসেলের অবস্থানকাল কমানো কঠিন হবে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি হতে পারে।
বিডব্লিউটিসিসির কনভেনর হাজী সফিক আহমেদের ভাষ্য, বহির্নোঙরে মাদার ভ্যাসেলের সংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজন অনুযায়ী লাইটারেজ জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। সিরিয়ালের বাইরে চলা জাহাজগুলোকে ব্যবস্থার মধ্যে আনা না গেলে সংকট সমাধান কঠিন হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
আমদানিকারকেরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন দেশের আমদানি পণ্য সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই লাইটারেজ জাহাজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে দ্রুত পণ্য খালাসের ব্যবস্থা করা জরুরি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি অর্থমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও কামনা করেছেন তারা।
ইতি/
