, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 31° সে. | 💧 আদ্রতা 65%

২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনায় পরিবর্তন

নিজস্ব প্রতিবেদক

আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনা নিয়ে নতুন বর্ণনা যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের পাঠ্যবই, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পরিমার্জিত বই এবং নতুন শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রস্তুত করা বইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বিবরণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।

পাঠ্যবইয়ের এই পরিবর্তন দেশের ইতিহাস উপস্থাপনে রাজনৈতিক সরকারের প্রভাব এবং শিক্ষার্থীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনায় কী পরিবর্তন আসছে?

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে মুক্তিসংগ্রাম ও গণ-আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা হচ্ছে। নতুন বর্ণনায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যার পর চট্টগ্রামে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের বিদ্রোহ, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারের বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এতে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং পরদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার বিষয়টি আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিবরণও রাখা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের পাঠ্যবইয়ে যা ছিল

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাঠ্যবই পরিমার্জন করা হয়। ওই সময়ের সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বলা হয়েছিল, ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর ২৭ মার্চ তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

অর্থাৎ, ওই সংস্করণে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও ২০২৭ সালের জন্য প্রস্তুত করা বর্ণনায় ২৫ মার্চ রাতের ঘটনাপ্রবাহ, তাঁর বিদ্রোহ এবং ঘোষণার সময় নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য যুক্ত করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছিল ভিন্ন বিবরণ

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যবহৃত ২০২২ সালের সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে, অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তিন সময়ের পাঠ্যবই তুলনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার ঘোষণার ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির ভূমিকা কীভাবে তুলে ধরা হবে এবং ঘটনার সময়ক্রম কীভাবে বর্ণিত হবে—এসব বিষয়ে পরিবর্তন এসেছে।

ইতিহাসের অন্য যেসব বিষয় যুক্ত হচ্ছে

স্বাধীনতার ঘোষণা ছাড়াও ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধটিও পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া চতুর্থ শ্রেণিতে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’ নামে চারটি নতুন বই যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ইতিহাসচর্চার প্রশ্ন

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গবেষক আফসান চৌধুরীর মতে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ইতিহাসচর্চায় রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের আলোচনায় অনেক সময় ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা বেশি গুরুত্ব পায়। তিনি রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের পাশাপাশি সমাজের ইতিহাস ও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা নিয়েও গবেষণা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় উঠে আসা এই বিষয়টি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ: পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তথ্যের নির্ভুলতা, প্রামাণ্য দলিলের ব্যবহার এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার ভারসাম্যপূর্ণ ব্যাখ্যা নিশ্চিত করা জরুরি।

২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে এসব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুনভাবে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ও তথ্যগত নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখাই হওয়া উচিত পাঠ্যবই পরিমার্জনের প্রধান বিবেচনা।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত