মিথ্যা ঘোষণা, শুল্ক ফাঁকির আশঙ্কা ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসা ১৬৮টি আমদানি চালান আটকে দিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। এসব চালানের মধ্যে কায়িক পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চালানে অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে। শনাক্ত অনিয়মের বিপরীতে শুল্ক-কর ও জরিমানা মিলিয়ে মোট ১৩ কোটি ৬ লাখ টাকা আদায় করেছে কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অডিট ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে চালানগুলো লক করে। সংশ্লিষ্ট চালান আনলক না হওয়া পর্যন্ত বন্দরসহ নির্ধারিত স্থাপনা থেকে পণ্য খালাসের সুযোগ থাকে না।
কাস্টমসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে লক করা চালানের মধ্যে ১৩৯টির কায়িক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫টি চালানে ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের মিল পাওয়া যায়। বাকি ৮৪টি চালানে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম শনাক্ত হয়। এসব চালানের মধ্যে ৫৭টির বিপরীতে শুল্ক-কর আদায় করা হয়েছে। অন্য ২৭টি চালানের ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়া চলছিল।
এদিকে সেপ্টেম্বর ও তার আগের সময়ে লক করা চালানের মধ্যে আরও ১৬৬টির কায়িক পরীক্ষা করা হয়েছে। এসব চালানের মধ্যে ৯০টিতে অনিয়ম উদ্ঘাটন করা হয়। এর মধ্যে ৬৭টি চালানের বিপরীতে শুল্ক-কর আদায় করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষিত চালানগুলোর মধ্যে অনিয়ম শনাক্তের হার ছিল ৫৪ দশমিক ২২ শতাংশ। এসব অনিয়মের বিপরীতে ৭ কোটি ১১ লাখ টাকা শুল্ক-কর এবং ৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। সব মিলিয়ে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৬ লাখ টাকা।
যেভাবে শনাক্ত হয় সন্দেহজনক চালান
কাস্টমস কর্মকর্তারা আমদানি-সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাইয়ের সময় পণ্যের উৎপাদনকারী দেশ, রপ্তানিকারক দেশ, পণ্যের উৎস ও ধরন এবং আমদানিকারকের পূর্ববর্তী কার্যক্রম পর্যালোচনা করেন। এসব তথ্যের পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতেও সন্দেহজনক চালান শনাক্ত করে লক করা হয়।
এআইআর শাখার পাশাপাশি শুল্ক গোয়েন্দা ও এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলও (সিআইসি) সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায় আমদানি চালান আটকে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে পারে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কার্যক্রম শুধু রাজস্ব আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমদানি পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, শিল্পকারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সহায়তা, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষাও এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের অংশ
সেপ্টেম্বরে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। বিপরীতে মাসটির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ হাজার ৫০১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭ হাজার ৯৪৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ১০ হাজার ৯৮৬ কোটি ১১ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় ৬ হাজার ৯৩৬ কোটি ১১ লাখ টাকা। আগস্টে ১০ হাজার ৫৪৪ কোটি ২৩ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় দাঁড়ায় ৭ হাজার ৬১৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। দৈনিক গড় লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৩২১ কোটি টাকা।
রাজস্ব আদায় বাড়াতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও আমদানি পণ্যের শুল্কায়ন ও খালাস কার্যক্রম চালু রাখছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। তবে ব্যাংক, শিপিং এজেন্ট, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকদের কার্যালয় বন্ধ থাকাসহ বিভিন্ন কারণে এ উদ্যোগের প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে দেশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমদানি কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় চালান যাচাইয়ে অনিয়ম শনাক্ত ও রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি পণ্য খালাসের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখাও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
ইতি/
