২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন। তবে তাঁর বিদায়ের সিদ্ধান্ত কোনো একক ঘটনার ফল ছিল না। এর আগে কয়েক দিন ধরে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে উচ্চপর্যায়ে ধারাবাহিক আলোচনা চলছিল। শেষ পর্যন্ত দ্রুত পরিবর্তিত বাস্তবতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতির মূল্যায়ন এবং আন্দোলনের বিস্তারের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ৩ আগস্ট সেনা সদরে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে অনাগ্রহের অবস্থান উঠে আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। একই সময় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে থাকে এবং সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে।
এর পরদিন, ৪ আগস্ট গভীর রাত পর্যন্ত গণভবনে মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলন মোকাবিলা, জরুরি অবস্থা জারি, রাজনৈতিক সমঝোতা কিংবা প্রশাসনিক পদক্ষেপ—বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তব পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির কারণে কোনো কার্যকর সমাধান সামনে আসেনি বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
একাধিক সূত্রের দাবি, ওই সময় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনার সঙ্গে পৃথক বৈঠকে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সর্বশেষ মূল্যায়ন তুলে ধরেন এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ বিবেচনার পরামর্শ দেন। পরদিন সকালে আবারও গণভবনে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৫ আগস্ট সকাল থেকে রাজধানীমুখী বিপুল সংখ্যক আন্দোলনকারী বিভিন্ন দিক থেকে ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন এবং সামগ্রিক বাস্তবতা বিবেচনায় শেখ হাসিনা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
পরে তিনি ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে গণভবন ত্যাগ করেন। প্রথমে বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। সেখান থেকে বিমানবাহিনীর একটি পরিবহন বিমানে ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করেন। পরদিন ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর জানান, শেখ হাসিনা স্বল্প সময়ের নোটিশে ভারতে সাময়িকভাবে প্রবেশের অনুমতি চেয়েছিলেন এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ তাঁর বিমান চলাচলের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রের বিষয়ে যোগাযোগ করেছিল।
এদিকে সংকটের শেষ পর্যায়ে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ায় সরকারের সামনে কার্যকর বিকল্প ক্রমেই সীমিত হয়ে আসে। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাও পরবর্তী সময়ে স্বীকার করেন, সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্টের ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, গণআন্দোলনের বিস্তার, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব এবং দ্রুত পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতার সম্মিলিত ফল। কয়েক দিনের ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহের পর শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
ইতি/
