, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 31° সে. | 💧 আদ্রতা 63%

চবির শাটলে আসন সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) প্রায় ২৮ হাজার শিক্ষার্থীর যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম শাটল ট্রেন। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও ক্যাম্পাসজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকা এই পরিবহনব্যবস্থায় এখন দেখা দিয়েছে ধারণক্ষমতার ঘাটতি, আসন সংকট, সময়সূচির অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত নানা সমস্যা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতিদিনের যাত্রায় এসব ভোগান্তি তাদের ক্লাস, পরীক্ষা ও স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনকে ব্যাহত করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসংখ্যা ও বিভাগ বাড়লেও সেই অনুপাতে শাটল ট্রেনের সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে ব্যস্ত সময়ে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ সামলাতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে যাতায়াত করতে হচ্ছে। অনেককে দরজার কাছে, সিঁড়িতে কিংবা বগির সংযোগস্থলে অবস্থান করতে দেখা যায়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

শিক্ষার্থী বাড়লেও বাড়েনি পরিবহন সক্ষমতা

বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন দুটিতে ১০টি করে বগি রয়েছে। প্রতিটি বগির ধারণক্ষমতা সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ৬০ জন হলেও ব্যস্ত সময়ে এর তুলনায় কয়েক গুণ বেশি শিক্ষার্থী যাতায়াত করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২১ সালের নভেম্বরে ডেমু ট্রেনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শাটল ট্রেনের ওপর যাত্রীচাপ আরও বেড়েছে। পর্যাপ্ত পরিবহন না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করতে হচ্ছে।

আসন সংকটে বহিরাগতদের উপস্থিতি নিয়েও অভিযোগ

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শাটলে বহিরাগতদের নিয়মিত যাতায়াতের কারণে আসন সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত পরিবহনব্যবস্থায় তাদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বলেও দাবি করছেন কেউ কেউ।

পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী মোস্তফা আহমেদ বলেন, বহিরাগতদের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের বসার জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি বাড়ানো হলে সমস্যাটি কিছুটা কমতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সময়সূচির অনিশ্চয়তায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষাজীবন

শাটল ট্রেনের নির্ধারিত সময় নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তাদের ভাষ্য, অনেক সময় স্টেশনে অপেক্ষা করেও নির্ধারিত সময়ে ট্রেন পাওয়া যায় না। এতে ক্লাস, পরীক্ষা ও জরুরি কাজে সময়মতো ক্যাম্পাসে পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সীমা আক্তার বলেন, শাটলের সময়সূচি নিয়ে নিয়মিত সমস্যায় পড়তে হয়। স্টেশনে অপেক্ষা করেও অনেক সময় ট্রেন না পাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। পাশাপাশি ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ট্রেনে ইট নিক্ষেপ, বগির সংখ্যা কমে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত জায়গা না পাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ জানান এই শিক্ষার্থী।

নিরাপত্তা ও বগির পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শাটল ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ, চুরি-ছিনতাই এবং নারী শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির মতো ঘটনা যাত্রাপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। এসব কারণে অনেকের কাছে শাটলযাত্রা স্বস্তির পরিবর্তে আতঙ্কের অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে।

এ ছাড়া বগির ফ্যান ও বাতি নিয়মিত কাজ না করার অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে গরমের সময় এসব সমস্যায় যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ে।

সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আশিক বলেন, বগির ফ্যান ও লাইট কখনো কাজ করে, আবার কখনো করে না। এতে যাত্রার সময় অস্বস্তিতে পড়তে হয়।

সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের আশ্বাস

শাটল ট্রেনের চলমান সমস্যাগুলো সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান।

তিনি বলেন, আগামী মাসের মধ্যেই কিছু পদক্ষেপ দৃশ্যমান হবে। শিগগিরই একটি পূর্ণাঙ্গ কোচ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি আগামী তিন মাসের মধ্যে অন্তত তিনটি স্টেশন সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। রেলপথের দুই পাশে থাকা বস্তি ও অবৈধ স্থাপনাগুলোও পরিষ্কার করা হবে বলে জানান তিনি।

ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন কেবল শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও শিক্ষার্থীদের স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ট্রেনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বন্ধুত্ব, অভিজ্ঞতা ও ক্যাম্পাসজীবনের নানা গল্প।

তবে শিক্ষার্থীসংখ্যার তুলনায় পরিবহন সক্ষমতার ঘাটতি, আসন সংকট, সময়সূচির অনিয়ম, নিরাপত্তা সমস্যা ও অব্যবস্থাপনা শাটলযাত্রাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।

শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, প্রশাসনের ঘোষিত পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি ট্রেনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিয়মিত সময়সূচি নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা জোরদার এবং বগির প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে শাটল ট্রেনের ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত