, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 31° সে. | 💧 আদ্রতা 63%

বোয়ালখালীতে বালু বাণিজ্যের বিস্তার, কোথা থেকে আসছে বালু?

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায় বৈধ বালুমহাল না থাকলেও প্রকাশ্যে চলছে বালুর ব্যবসা এমন অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার চরণদ্বীপ, খরণদ্বীপ ও কধুরখীল এলাকায় ৩০টিরও বেশি বালু বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে উঠেছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এসব কেন্দ্রে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল পরিমাণ বালু এনে স্তূপ করে বিক্রি করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের তুলনায় রাতের বেলায় বালুবাহী ভারী ট্রাকের চলাচল বেড়ে যায়। ১০ ও ১২ চাকার ট্রাকসহ বিভিন্ন ভারী যানবাহনে করে এসব বালু আনা হচ্ছে। এতে একদিকে সড়কের ওপর বাড়ছে চাপ, অন্যদিকে স্থানীয়দের স্বাভাবিক চলাচল, পরিবেশ ও জননিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বোয়ালখালীতে যদি বৈধ বালুমহাল না থাকে, তাহলে এত বিপুল পরিমাণ বালু আসছে কোথা থেকে?

রাউজানের বালুমহালের নামেই কি বালু?

স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, বোয়ালখালীর বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্রে রাউজানের নোয়াপাড়া ও বাগোয়ান এলাকার বালুমহালের নাম ব্যবহার করে বালু সরবরাহ করা হচ্ছে।

তবে কোনো বিক্রয়কেন্দ্রের মালিক শুধু একটি বালুমহালের নাম বললেই বালুর উৎস বৈধ প্রমাণিত হয় না। সংশ্লিষ্ট বালুমহালের ইজারা, ইজারার মেয়াদ, সীমানা এবং বালু উত্তোলনের অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া ওই বালুমহাল থেকে বাস্তবে কত পরিমাণ বালু উত্তোলন করা হচ্ছে এবং তার কত অংশ বোয়ালখালীর বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছে সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

অনাপত্তিপত্র থাকলেই কি বালু উত্তোলন বৈধ?

সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একটি নথিতে নির্দিষ্ট স্থানে বালু সংরক্ষণ ও বিপণনের বিষয়ে অনাপত্তি প্রদানের কথা উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো জমিতে বালু সংরক্ষণ বা বিক্রয়ের অনুমতি থাকা এবং নদী বা বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলনের বৈধ ইজারা থাকা এক বিষয় নয়।

অর্থাৎ কোনো বিক্রয়কেন্দ্রের জমির কাগজ বা অনাপত্তি থাকলেও বালুটি কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে উত্তোলন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বালুমহালের ইজারা বৈধ কি না এসব বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।

৩০টির বেশি বিক্রয়কেন্দ্র, বৈধতা কতটির?

স্থানীয়দের দাবি সত্য হলে চরণদ্বীপ, খরণদ্বীপ ও কধুরখীল এলাকায় ৩০টিরও বেশি বালু বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে।

এসব কেন্দ্রের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রের ক্ষেত্রে জমির মালিকানা, দাগ ও খতিয়ান, বালু সংরক্ষণ ও বিক্রয়ের অনুমতি, বালুর উৎস, সংশ্লিষ্ট বালুমহালের ইজারা এবং পরিবহনের কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

রাতের আঁধারে ভারী ট্রাক, বাড়ছে জনদুর্ভোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের বেলায় বালুবাহী ভারী ট্রাকের চলাচল সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এসব ট্রাক চলাচল করে স্থানীয় সড়ক দিয়েই।

ফলে সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপের পাশাপাশি ধুলাবালি, শব্দ, যানজট এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

বিশেষ করে স্কুল, বাজার ও চিকিৎসাকেন্দ্রের আশপাশের সড়কে ভারী ট্রাক চলাচল নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

একজন স্থানীয় অভিভাবক বলেন, ‘বৈধ ব্যবসা বন্ধের কথা আমরা বলছি না। কিন্তু শিশুদের চলাচলের সড়কে নিয়মিত ভারী ট্রাক চলাচল করলে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রশাসনকে দেখতে হবে।’

কধুরখীলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান

বালু বিক্রয়কেন্দ্র নিয় অভিযোগের মধ্যেই গত ১০ সেপ্টেম্বর কধুরখীলের গুইলদ্যাখালী ব্রিজ এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অবৈধভাবে বালু বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন এবং সরকারি সড়কের নিরাপত্তা খুঁটি উপড়ে ফেলার অভিযোগে এক বালু ব্যবসায়ীকে সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে যদি একটি বিক্রয়কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে একই এলাকায় থাকা অন্য বিক্রয়কেন্দ্রগুলোর বৈধতা কতটা যাচাই করা হয়েছে?

পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ

বালু উত্তোলনের সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, নদীতীর, তীরভাঙন ও স্থানীয় পরিবেশের বিষয় জড়িত।

কোথা থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, কত গভীর পর্যন্ত কাটা হচ্ছে এবং এতে নদীর গতিপথ বা তীরভাঙনের ওপর কোনো প্রভাব পড়ছে কি না তা বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন

বোয়ালখালীতে বালুর ব্যবসা নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্নগুলো মূলত কয়েকটি বিষয়কে ঘিরে-

বোয়ালখালীতে বর্তমানে বৈধ বালুমহাল আছে কি না?

না থাকলে বালু আসছে কোথা থেকে?

কোন বালুমহালের ইজারার ভিত্তিতে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে?

চরণদ্বীপ, খরণদ্বীপ ও কধুরখীলে থাকা বিক্রয়কেন্দ্রগুলোর কতটির অনুমোদন রয়েছে?

প্রতিদিন কত ট্রাক বালু বোয়ালখালীতে ঢুকছে?

এসব বালুর উৎস ও কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে কি না?

সরকার কত টাকা রাজস্ব পাচ্ছে?

এ ছাড়া গত এক বছরে অবৈধ বালু উত্তোলন ও বিক্রয়ের বিরুদ্ধে কতটি অভিযান, মামলা ও জরিমানা হয়েছে—সেটিও প্রকাশের দাবি রয়েছে।

বৈধ ব্যবসা থাকুক, তবে কাগজপত্রসহ

স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, তারা বৈধ বালু ব্যবসার বিরোধিতা করছেন না। তাদের দাবি, বৈধ ও অবৈধ ব্যবসা আলাদা করে দেওয়া হোক।

প্রশাসন প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রের কাগজপত্র, বালুর উৎস, ইজারা এবং পরিবহনের বৈধতা যাচাই করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন তারা।

বোয়ালখালীর মানুষের প্রশ্ন, বালুর ব্যবসা যদি বৈধ হয়, তাহলে সেই বৈধতার কাগজ প্রকাশ্যে আনতে সমস্যা কোথায়?

এখন তাই শুধু বালুর স্তূপ নয়, বালুর উৎস ও বৈধতার কাগজপত্রও প্রকাশের দাবি উঠেছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো বিষয়টি সমন্বিতভাবে তদন্ত করে বৈধ ব্যবসায়ীদের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি অবৈধ বালু উত্তোলন ও বিক্রয়ের অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত