চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্থানীয় চাহিদার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হলেও নগরবাসীর বিদ্যুৎ ভোগান্তি কমছে না। বিশেষ করে সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে উৎপাদন প্রায় ৩ হাজার ৭৪০ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা আধুনিক ও নিরবচ্ছিন্ন করতে ২০১৮ সালে নেওয়া হয় প্রায় ২ হাজার ৭৬৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকার একটি প্রকল্প। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে দুই দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও প্রকল্পটির কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। বর্তমানে এর মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় নতুন উপকেন্দ্র নির্মাণ, পুরোনো উপকেন্দ্র আধুনিকায়ন, ট্রান্সফরমার স্থাপন এবং বিতরণ লাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
পিডিবির পরিবীক্ষণ তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় নতুন ২২টি উপকেন্দ্র নির্মাণ এবং সাতটি উপকেন্দ্র আধুনিকায়নের পরিকল্পনা থাকলেও ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত এসব কাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। প্রতিবেদনে উপকেন্দ্রসংক্রান্ত কাজের অগ্রগতি ‘শূন্য’ দেখানো হয়েছিল।
ট্রান্সফরমার নিয়েও জটিলতা
প্রকল্পে ২৫০ কেভির ৩ হাজার ৮১২টি এবং ৫০ কেভির ১ হাজারটি ট্রান্সফরমার স্থাপনের লক্ষ্য ছিল। ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত নথি অনুযায়ী ২৫০ কেভির ৮৩২টি এবং ৫০ কেভির মাত্র ২৮টি স্থাপনের তথ্য পাওয়া যায়।
পিডিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ট্রান্সফরমারগুলো পরবর্তীতে স্থাপন করা হলেও প্রকল্পের শুরুর দিকে কেনা যন্ত্রপাতির ওয়ারেন্টি মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। কিছু ট্রান্সফরমার খুলে রাখার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিতরণ লাইনেও পিছিয়ে প্রকল্প
প্রকল্পে বিদ্যমান বিতরণ লাইন আধুনিকায়নের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৫৪১ কিলোমিটার। এর বিপরীতে বাস্তবায়ন হয়েছে ৬৬৮ কিলোমিটার।
এ ছাড়া ৮০ হাজার ৪০০টি বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপনের লক্ষ্যের বিপরীতে বসানো হয়েছে ৩৪ হাজার ৪২০টি। নতুন বিতরণ লাইন নির্মাণের লক্ষ্য ছিল ২ হাজার ৫৯৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮৯০ কিলোমিটার নির্মাণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ নতুন বিতরণ লাইনের প্রায় ২৮ শতাংশ কাজ এখনো বাকি রয়েছে।
ব্যয় বেড়েছে, বাড়ছে মেয়াদ
প্রকল্পটির প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ২ হাজার ৫০১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। পরে সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় বাড়িয়ে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি ৬১ লাখ টাকা করা হয়। সর্বশেষ সংশোধনে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা।
প্রথমে ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে করোনা মহামারি, আমদানি বিলম্ব, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা ও অর্থ বরাদ্দের সীমাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে সময় বাড়ানো হয়। বর্তমানে প্রকল্পের শেষ সময় ২০২৭ সালের ৩০ জুন।
অডিটে পাঁচ আপত্তি
প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও অডিট আপত্তি উঠেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের অডিটে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নিয়ম না মানা, ডিপিপির নির্দেশনা অনুসরণ না করা এবং একই ধরনের কাজ বিভক্ত করে ঠিকাদার নিয়োগসহ পাঁচটি আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে।
অডিট নথিতে এসব আপত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪৪৭ কোটি ৭৭ লাখ ৭৪ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সিসিজিপির অনুমোদন ছাড়া ক্রয়, বিলম্বের জন্য জরিমানা আদায় না করা এবং নির্ধারিত নিয়মের বাইরে সরবরাহকারী নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে।
উৎপাদন বেশি হলেও কেন লোডশেডিং?
চট্টগ্রামে উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান থাকলেও স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির বিষয়ে পিডিবির কর্মকর্তারা জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
পিডিবির চট্টগ্রাম সিস্টেম কন্ট্রোলের কর্মকর্তার ভাষ্য, চট্টগ্রামে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি শুধু নগরেই ব্যবহৃত হয় না; জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। ফলে জাতীয় গ্রিডে চাপ থাকলে চট্টগ্রামেও সরবরাহে প্রভাব পড়ে।
পিডিবির চেয়ারম্যানও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, নতুন করে বরাদ্দ পাওয়ায় প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা চলছে।
তবে বিপুল অর্থের এই প্রকল্প দীর্ঘ সময়েও পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও চট্টগ্রামবাসী কবে একটি নির্ভরযোগ্য ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা পাবে?
ইতি/
