হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা শুধু তেল ও গ্যাসের বাজারেই চাপ তৈরি করছে না, বদলে দিচ্ছে বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার কৌশলও। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ ও বড় শিপিং কোম্পানিগুলো এখন বিকল্প রুট, নতুন সরবরাহকারী এবং বাড়তি মজুতের দিকে ঝুঁকছে।
১৯ আগস্টের Reuters প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ছয়টি পণ্যবাহী জাহাজ পার হয়েছে। এর বিপরীতে আগের ১০ দিনের গড় ছিল ১১টি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পক্ষ থেকে প্রণালিটির পরিস্থিতি নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থাকায় জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
হরমুজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা—IEA-এর হিসাবে, ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়েছে। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সঙ্গে এই নৌপথের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
বিকল্প পথে জ্বালানি পরিবহন
সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোও হরমুজের বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থা ব্যবহারে জোর দিচ্ছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর পাইপলাইন ও সমুদ্রবন্দরভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থা থাকায় তারা আংশিকভাবে হরমুজ এড়িয়ে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে।
এদিকে এশিয়ার বড় আমদানিকারকরাও সরবরাহের উৎস ও পরিবহনপথে বৈচিত্র্য আনছে। Reuters জানিয়েছে, চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দুটি বড় শিপিং কোম্পানি COSCO Shipping Energy Transportation ও China Merchants Energy Shipping জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব এড়িয়ে চলার কৌশল নিয়েছে। এর পরিবর্তে উপসাগরের বাইরে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরসহ বিকল্প ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।
জাপানের একটি বড় তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানও সৌদি আরব থেকে সুয়েজ খাল ও কেপ অব গুড হোপ হয়ে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ শুরু করেছে। এতে পরিবহন সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—তবে সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় মেনে নিচ্ছে আমদানিকারকেরা।
শুধু তেল নয়, ঝুঁকিতে এলএনজিও
হরমুজ সংকটের প্রভাব অপরিশোধিত তেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। IEA বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন প্রায় থমকে যাওয়ায় বৈশ্বিক তেলবাজারে নজিরবিহীন সরবরাহ-ধাক্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এর প্রভাব পড়ে শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও কৃষি খাতেও। কারণ জ্বালানি ও এলএনজির পাশাপাশি পেট্রোকেমিক্যাল, সার এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল পরিবহনের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ।
বাড়ছে পরিবহন ও বীমা ব্যয়
নৌপথে ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজ পরিচালনার ব্যয়ও বেড়েছে। দীর্ঘ বিকল্প পথে জাহাজ ঘুরিয়ে নিতে হলে সময় ও জ্বালানি খরচ বাড়ে। একই সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় চলাচলের কারণে বীমা প্রিমিয়ামও বাড়তে পারে।
ফলে সংকটের প্রভাব শুধু জ্বালানি আমদানিকারকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিবহন ব্যয়ের মাধ্যমে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পণ্য উৎপাদন, আমদানি, খুচরা বাজার এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ব্যয়েও।
UNCTAD-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, হরমুজ দিয়ে শিপিং ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি, পরিবহন, লজিস্টিকস ও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বৈশ্বিক পণ্যবাণিজ্যের মূল্য প্রায় ১৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে; তবে এর একটি অংশ এসেছে উচ্চমূল্যের প্রভাব থেকে।
সরবরাহব্যবস্থায় আসছে নতুন কৌশল
বিশ্ব অর্থনীতিতে এর সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হতে পারে সরবরাহব্যবস্থার নকশায়। এতদিন অনেক প্রতিষ্ঠান কম খরচে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সীমিতসংখ্যক দেশ, বন্দর ও পরিবহনপথের ওপর নির্ভর করত। কিন্তু মহামারি, লোহিত সাগর সংকট এবং এখন হরমুজ পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে—কম খরচের পাশাপাশি ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাও ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতে একই পণ্যের জন্য একাধিক সরবরাহকারী, বিকল্প বন্দর, বিভিন্ন পরিবহনপথ এবং বিভিন্ন অঞ্চলে মজুত রাখার প্রবণতা বাড়তে পারে। সরকারগুলোও কৌশলগত জ্বালানি মজুত এবং বিকল্প অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব দ্রুত কমে যাবে—এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং পরিবর্তন আসতে পারে নির্ভরতার ধরনে। একটি নির্দিষ্ট নৌপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বদলে একাধিক রুট ও সরবরাহ উৎসের সমন্বয়কে গুরুত্ব দিতে পারে আমদানিকারক দেশগুলো।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা পুরো বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় কত দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। ১৯ আগস্টও হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরেনি এবং তেলের দাম টানা চতুর্থ দিনের মতো বেড়েছে। Reuters-এর হিসাবে, সেদিন ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১.৭১ ডলারে উঠেছিল।
ফলে হরমুজ সংকটের স্থায়ী প্রভাব শুধু তেলের দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ কৌশলে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে—কীভাবে একটি নির্দিষ্ট দেশ, সরবরাহকারী বা নৌপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে একই সঙ্গে খরচ ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, সংকট শেষ হলেও এই শিক্ষা ব্যবসা ও রাষ্ট্রগুলোর নীতিনির্ধারণে দীর্ঘদিন প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ভবিষ্যতের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় শুধু দ্রুত ও সস্তা সরবরাহ নয়, বিকল্প ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও স্থিতিস্থাপকতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইতি /
