, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 28° সে. | 💧 আদ্রতা 89%

এক্সপ্রেসওয়ে-ওভারপাসের চাপে আটকে গেল দেওয়ানহাটে নতুন সেতু

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম নগরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ দেওয়ানহাট সেতু দীর্ঘদিনের ব্যবহারে এখন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় পাঁচ দশক আগে নির্মিত সেতুটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। তবে বিদ্যমান এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও দেওয়ানহাট ওভারপাসের কারণে নতুন সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না।

চসিকের সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের জরিপে এ জটিলতা উঠে এসেছে। প্রকৌশলীরা বলছেন, রেলওয়ের নির্ধারিত উচ্চতা বজায় রেখে প্রচলিত নকশায় নতুন সেতু নির্মাণ করতে গেলে এর দৈর্ঘ্য বর্তমানের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি বাড়াতে হবে। কিন্তু আশপাশের অবকাঠামোর কারণে সেই সম্প্রসারণের সুযোগ নেই।

চসিকের তথ্য অনুযায়ী, দেওয়ানহাট সেতুর বর্তমান দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ মিটার। রেললাইনের ওপর দিয়ে চলাচলকারী সেতুর উচ্চতা রেলওয়ের নীতিমালা অনুযায়ী অন্তত সাড়ে আট মিটার হওয়া প্রয়োজন। নতুন সেতুতে এই উচ্চতা নিশ্চিত করতে গেলে দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে প্রায় ১৬০ মিটার করতে হবে।

কিন্তু সেতুর উত্তর পাশে রয়েছে দেওয়ানহাট ওভারপাস এবং এর ওপর দিয়ে চলে গেছে শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়ালসড়ক নামে পরিচিত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ফলে প্রয়োজনীয় জায়গা না থাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে নতুন সেতু নির্মাণকে কঠিন বলে মনে করছেন প্রকৌশলীরা।

চসিকের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমানের ভাষ্য, বর্তমান অবকাঠামোগত অবস্থায় নতুন সেতুর জন্য প্রয়োজনীয় দৈর্ঘ্য তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই বিকল্প হিসেবে পুরোনো সেতুকে আধুনিক প্রযুক্তিতে শক্তিশালী করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুরোনো সেতুতে নানা ক্ষতি

চসিকের জরিপে দেওয়ানহাট সেতুতে কাঠামোগত দুর্বলতা, অতিরিক্ত ভারের চাপ এবং বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে।

সেতুর বিভিন্ন অংশে ফাটল, কংক্রিট খসে পড়া এবং রডে ক্ষয়ের মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে সেতুর কিছু অংশ নিচের দিকে দেবে যাওয়ায় নির্মাণকালের তুলনায় এর উচ্চতাও কমেছে।

এ ছাড়া সেতুটি নির্মাণের সময় যে পরিমাণ ভার বহনের কথা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল, বর্তমানে তার তুলনায় অনেক বেশি ওজনের যান চলাচল করছে। বিশেষ করে ভারী মালবাহী যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ সেতুর ওপর প্রভাব ফেলছে।

সেতুর বিয়ারিংয়ের দুর্বলতা এবং এক্সপ্যানশন জয়েন্টে ময়লা জমে যাওয়াও কাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে জানিয়েছে চসিক।

৪৪০ মিটার সেতুর প্রস্তাব

নতুন সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। এর একটি হলো বর্তমান সেতু ভেঙে একই স্থানে নতুন সেতু নির্মাণ। তবে এতে রেলওয়ের নির্ধারিত উচ্চতা বজায় রাখতে গেলে সেতুটি অতিরিক্ত খাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে ভারী যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি ছোট যানবাহনের চলাচলেও সমস্যা হতে পারে।

আরেকটি প্রস্তাব হলো এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে নতুন সেতুর সংযোগ তৈরি করা। তবে এ ক্ষেত্রে বড় পরিমাণে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।

এ ছাড়া লুপ পদ্ধতিতে সেতু নির্মাণের একটি পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে মূল সেতুর দৈর্ঘ্য হতে পারে প্রায় ৪৪০ মিটার এবং র‌্যাম্পের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০০ মিটার।

শেষ পর্যন্ত রেট্রোফিটিংয়ের দিকে নজর

বিকল্পগুলোর কোনোটিই বাস্তবায়নযোগ্য না হলে বিদ্যমান সেতুটিকে শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে রেট্রোফিটিং করলে সেতুটির ভারবহনক্ষমতা প্রায় ৪৫ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে এর ব্যবহারযোগ্য আয়ু আরও ২৫ থেকে ৩০ বছর বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনের ওপর দেওয়ানহাট সেতুটি নির্মাণ করা হয়। রেললাইনের কারণে সড়ক যোগাযোগে যে বিঘ্ন সৃষ্টি হতো, তা কমানোর উদ্দেশ্যেই তৎকালীন সড়ক ও জনপথ বিভাগ সেতুটি নির্মাণ করে। বর্তমানে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব চসিকের।

প্রায় ৬০ ফুট প্রশস্ত সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে। ফলে সেতুটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বড় অবকাঠামো নির্মাণের সময় বিদ্যমান ও ভবিষ্যৎ যোগাযোগব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে এমন জটিলতা তৈরি হয়। দেওয়ানহাট সেতুকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতিকে তাঁরা দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার ঘাটতির উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত