, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 26° সে. | 💧 আদ্রতা 95%

অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানোর পথ দেখাল চমেকের গবেষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক

অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের কারণে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালৎ রেজিস্ট্যান্স (এএমআর)। এ পরিস্থিতিতে সেপসিসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে রক্তে প্রোক্যালসিটোনিন (পিসিটি) পরীক্ষার ফল বিবেচনায় নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সময় কমানোর সম্ভাবনা দেখিয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পরিচালিত একটি গবেষণা।

২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত চমেক হাসপাতালে ব্যাকটেরিয়াজনিত সেপসিস বা সম্ভাব্য সেপসিস নিয়ে ভর্তি প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের ওপর গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণায় নেতৃত্ব দেন মেডিসিন ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডা. ফরহাদ উদ্দীন হাসান চৌধুরী।

গবেষণায় ৫৩২ জন রোগীকে দুটি সমান দলে ভাগ করা হয়। একটি দলের রোগীদের রক্তে নিয়মিত পিসিটি পরীক্ষা করা হয়। অন্য দলের চিকিৎসা প্রচলিত ক্লিনিক্যাল মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, পিসিটি পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকা রোগীদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ দলের রোগীরা গড়ে ৪ দশমিক ৭ দিন অ্যান্টিবায়োটিক পেয়েছেন। অন্যদিকে প্রচলিত পদ্ধতিতে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে গড় সময় ছিল ৯ দিন।

শুধু চিকিৎসার সময় নয়, মোট অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পরিমাণও পিসিটি-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় কম ছিল। গবেষণায় পিসিটি দলের মোট ব্যবহারের সময় ৭ দশমিক ২ দিন এবং নিয়ন্ত্রণ দলের ১৩ দশমিক ২ দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কীভাবে কাজ করে পিসিটি?

প্রোক্যালসিটোনিন শরীরে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বায়োমার্কার। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার সঙ্গে সঙ্গে রক্তে এর মাত্রা সাধারণত কমতে থাকে। ফলে নির্দিষ্ট সময় পরপর পিসিটির মাত্রা পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসকেরা রোগীর সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন।

গবেষণায় অ্যান্টিবায়োটিক শুরুর ৭২ ঘণ্টা পর পিসিটির মাত্রা নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে এলে অথবা সর্বোচ্চ মাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করার বিষয়টি বিবেচনার জন্য চিকিৎসকদের পরামর্শ দেওয়া হয়।

অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধে বাড়তি ঝুঁকি দেখা যায়নি

গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, পিসিটি অনুসরণ করে অ্যান্টিবায়োটিকের সময় কমানো হলেও রোগীর মৃত্যুহার বা পুনঃসংক্রমণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বাড়তি ঝুঁকি পাওয়া যায়নি।

২৮ দিনের পর্যবেক্ষণে পিসিটি দলের মৃত্যুহার ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রচলিত চিকিৎসা পাওয়া দলের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সময়ে পুনঃসংক্রমণের হার পিসিটি দলে ৩ শতাংশ এবং নিয়ন্ত্রণ দলে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল।

গবেষকদের মতে, এসব ফলাফল ইঙ্গিত করে যে রোগীর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার পর প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় অ্যান্টিবায়োটিক চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে নির্দিষ্ট বায়োমার্কার ব্যবহার করে চিকিৎসার মেয়াদ কমানোর সুযোগ রয়েছে।

এএমআর মোকাবিলায় সম্ভাবনাময় পদ্ধতি

অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকর হয়ে পড়া বর্তমানে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের বড় চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে জীবাণু ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে। এতে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও ভবিষ্যতে কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

গবেষকদের মতে, প্রচলিতভাবে শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা, সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিনসহ (সিআরপি) বিভিন্ন পরীক্ষার ফল চিকিৎসার সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত হয়। তবে এসব সূচক সব ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের অবস্থা নির্ভুলভাবে নির্দেশ করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে ধারাবাহিক পিসিটি পরীক্ষা চিকিৎসকদের অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধের সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত সহায়তা দিতে পারে।

গবেষণায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের খরচ কমার তথ্যও উঠে এসেছে। তবে পিসিটি পরীক্ষার অতিরিক্ত ব্যয় বিবেচনায় নিলে সরাসরি চিকিৎসা ব্যয় কিছুটা পরিবর্তিত হয়। গবেষকদের দাবি, অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় এই অতিরিক্ত ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম।

তবে বাংলাদেশে পিসিটি পরীক্ষার সুযোগ এখনো সীমিত এবং অনেক প্রতিষ্ঠানে এর খরচও তুলনামূলক বেশি। ফলে দেশের হাসপাতালগুলোতে এ পদ্ধতি ব্যাপকভাবে প্রয়োগের আগে পরীক্ষার সহজলভ্যতা, ব্যয় এবং রোগীর ধরন বিবেচনায় আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

ডা. ফরহাদ উদ্দীন হাসান চৌধুরী বলেন, সেপসিসের রোগীর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার পর রক্তে পিসিটির মাত্রা কমে গেলে দীর্ঘ সময় অ্যান্টিবায়োটিক চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, সঠিক রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সিদ্ধান্তের সহায়ক হিসেবে পিসিটি ব্যবহার করা গেলে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ কমানো এবং ভবিষ্যতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি মোকাবিলায় এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত