চট্টগ্রাম বিভাগে হামে আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকেই সংক্রমিত হয়েছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অবস্থান বা চিকিৎসা নেওয়ার পর হাম সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সম্মেলনকক্ষে এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের তৃতীয় গবেষণা প্রকল্পের ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। গবেষণার প্রধান গবেষক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহার ফলাফল তুলে ধরেন।
‘দক্ষিণ বাংলাদেশে ২০২৬ সালের হাম প্রাদুর্ভাব: রোগতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, ক্লিনিক্যাল চিত্র, জিনগত বিশ্লেষণ এবং মা ও শিশুর অ্যান্টিবডি পরিস্থিতি’ শীর্ষক গবেষণাটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিক রিসার্চ গ্রুপ ও এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয়। এতে অর্থায়ন করে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।
গবেষণায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল থেকে শিশু ও মায়েদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত নমুনার মধ্যে ১৭টির জিনোম সিকোয়েন্সিং করা হয়েছে। এতে হাম ভাইরাসের বি৩ জিনোটাইপ শনাক্ত হলেও নতুন কোনো ধরন পাওয়া যায়নি। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, শনাক্ত বি৩ জিনোটাইপ বাংলাদেশসহ বিভিন্ন স্থানে আগে শনাক্ত হওয়া ভাইরাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
টিকাবিহীন শিশুর হার বেশি
গবেষণায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে টিকাদানের চিত্রও উঠে এসেছে। ১৯৬ শিশুর মধ্যে ১৬৭ জন বা ৮৫ দশমিক ২ শতাংশের হাম প্রতিরোধী টিকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। এদের একটি বড় অংশ টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় ৪৬ শতাংশ শিশুর বয়স ছিল ৯ মাসের কম।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর পরও যেসব শিশু টিকা নেয়নি, তাদের ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব এবং টিকা দেওয়ার নির্ধারিত তারিখ ভুলে যাওয়ার বিষয়টি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
অপুষ্টিতে বাড়ছে জটিলতার ঝুঁকি
হামে আক্রান্ত শিশুদের গুরুতর অসুস্থতার সঙ্গে অপুষ্টিরও সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের প্রায় ৩১ শতাংশ মাঝারি বা তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল। গবেষকদের বিশ্লেষণে অপুষ্টিকে গুরুতর জটিলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীন ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষণায় প্রায় ৮৭ শতাংশ শিশুর অন্তত একটি জটিলতা দেখা যায়। এর মধ্যে নিউমোনিয়া ছিল সবচেয়ে বেশি। এছাড়া ডায়রিয়া, হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা, শক এবং মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো সমস্যাও দেখা গেছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের বড় একটি অংশ গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকার। তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ নিম্ন আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবারের বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, টিকাবিহীন শিশুদের গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি টিকা নেওয়া শিশুদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল। গবেষণায় টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে কোনো মৃত্যুর ঘটনা পাওয়া যায়নি।
টিকাদান ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জোর
হাম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদানের আওতা ৯৫ শতাংশের বেশি করার সুপারিশ করেছে গবেষণা দল। পাশাপাশি টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে দ্রুত টিকাদানের আওতায় আনা, আক্রান্তদের দ্রুত আলাদা রাখা এবং হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৪৬ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। এ কারণে ছয় মাস বয়স থেকে হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার সুপারিশ করেছে গবেষক দল। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
গবেষকেরা হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগী দ্রুত শনাক্ত করা, আক্রান্ত রোগীকে পৃথক রাখা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়ন ও নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শেখ ফজলে রাব্বি, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. জসিম উদ্দিন এবং চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীনসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও গবেষকেরা উপস্থিত ছিলেন।
ইতি/
