, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 28° সে. | 💧 আদ্রতা 89%

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর বাড়তি চাপ, আক্রান্তদের ৪৫ শতাংশ নারী ও শিশু

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় নারী ও শিশুদের আক্রান্তের হার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৬৯৫ জন। তাদের মধ্যে ৪৫৭ জন নারী এবং ৩১২ জন শিশু। অর্থাৎ নারী ও শিশু মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৬৯ জন, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৪৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে পুরুষ আক্রান্ত হয়েছেন ৯২৬ জন। মোট আক্রান্তের হিসাবে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও নারী ও শিশু মিলিয়ে আক্রান্তের হার মোট রোগীর প্রায় অর্ধেক।

পরিসংখ্যান বলছে, মোট আক্রান্তের ২৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ নারী এবং ১৮ দশমিক ৪১ শতাংশ শিশু। অর্থাৎ চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় পাঁচজন নারী অথবা শিশু।

আগস্টেই সংক্রমণের সর্বোচ্চ চাপ

চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে আগস্টের চিত্র। ১ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ২৪ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৬১ জন। বছরের মোট আক্রান্তের প্রায় ৫১ শতাংশ রোগীই শনাক্ত হয়েছেন এই সময়ের মধ্যে।

২৪ আগস্ট একদিনে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৮ জন ডেঙ্গু রোগী। তাদের মধ্যে ১৭ জন পুরুষ, ১২ জন নারী ও ৯ জন শিশু।

চলতি বছর ডেঙ্গুতে চট্টগ্রামে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজন পুরুষ ও দুজন নারী। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১২৬ জন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৫৬৩ জন।

মহানগরের পাশাপাশি উপজেলাতেও সংক্রমণ

আক্রান্তদের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার ৭৩৬ জন, জেলার বিভিন্ন উপজেলার ৭১৬ জন এবং অন্য জেলার ২৪৩ জন রয়েছেন।

উপজেলাগুলোর মধ্যে সীতাকুণ্ডে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—২০৫ জন। এরপর কর্ণফুলীতে ১২৯ জন। এছাড়া বাঁশখালীতে ৫৪, লোহাগাড়ায় ৪৭ এবং রাউজানে ৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

দেরিতে চিকিৎসা নেওয়া নিয়ে উদ্বেগ

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. হামিদুল্লাহ মেহেদীর মতে, ডেঙ্গুর উপসর্গকে সাধারণ জ্বর হিসেবে ধরে নিয়ে অনেকে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। এতে রোগীর অবস্থা জটিল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

বিশেষ করে নারী রোগীদের ক্ষেত্রে অসুস্থতার পরও দ্রুত চিকিৎসা না নেওয়ার প্রবণতা থাকলে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

বিআইটিআইডির মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মামুনুর রশিদও ডেঙ্গু আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, গর্ভাবস্থা বা শারীরিক দুর্বলতার মতো পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু হলে জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, বমি বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

এডিসের লার্ভায় মিলছে উচ্চঝুঁকির সংকেত

ডেঙ্গু পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চিত্র পাওয়া গেছে চট্টগ্রাম নগরের এডিস মশার লার্ভা জরিপেও।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেতৃত্বে ৮ থেকে ১৮ জুন নগরের ১৮টি ওয়ার্ডে পরিচালিত জরিপে ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। একই সময়ে পরীক্ষা করা ৩৪৫টি পানির পাত্রের মধ্যে ১১৪টিতে লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত হয়।

জরিপে কনটেইনার ইনডেক্স পাওয়া যায় ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ, হাউস ইনডেক্স ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ব্রেটো ইনডেক্স ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ। এসব সূচক সংশ্লিষ্ট নিরাপদ সীমার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বলে জরিপের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

জরিপের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম নগরের আটটি ওয়ার্ডকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো—১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী, ৩ নম্বর পাঁচলাইশ, ২ নম্বর জালালাবাদ, ১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া, ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া, ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা, ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা এবং ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর।

জরিপে পাওয়া লার্ভার বড় অংশ Aedes aegypti প্রজাতির বলে জানানো হয়েছে। পানি জমে থাকা, বাসাবাড়িতে সংরক্ষিত পানি এবং নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিকে এডিসের প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণাতেও চট্টগ্রামকে উচ্চঝুঁকির শহর হিসেবে দেখা হয়েছে

চট্টগ্রামের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ শুধু স্থানীয় জরিপেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে IJID Regions-এ প্রকাশিত ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন গবেষকের একটি গবেষণায় বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বার্ষিক পুনরাবৃত্তি এবং এর পেছনে নগরায়ণ, জনঘনত্ব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও মশা নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতার মতো বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় চট্টগ্রামসহ কয়েকটি বড় শহরকে ডেঙ্গুর উচ্চ সংক্রমণঝুঁকির এলাকার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণাটিতে আরও বলা হয়েছে, শুধু ফগিং বা কীটনাশক প্রয়োগের মতো স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন। টেকসই মশক নিয়ন্ত্রণ, জমে থাকা পানি অপসারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

শুধু ফগিং নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

চট্টগ্রামের বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি বলছে, সংক্রমণ এখন কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। আগস্টের প্রথম ২৪ দিনেই ৮৬১ রোগী শনাক্ত হওয়া, নারী ও শিশুদের উল্লেখযোগ্য আক্রান্তের হার এবং নগরের বিভিন্ন এলাকায় এডিসের উচ্চ লার্ভা ঘনত্ব—সব মিলিয়ে পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডে নিয়মিত রোগী, মৃত্যু, বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত শনাক্তকরণ ও তথ্যভিত্তিক মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ফগিংয়ের ওপর নির্ভর না করে বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, ড্রেন ও অন্যান্য সম্ভাব্য প্রজননস্থল নিয়মিত পরিষ্কার করা, জমে থাকা পানি অপসারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ধারাবাহিক নজরদারি চালাতে হবে। একই সঙ্গে জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত