তুরস্কের ইরান সীমান্তবর্তী আগ্রি প্রদেশের দোগুবায়াজিত এলাকায় জাহাজের মতো দেখতে একটি ভূতাত্ত্বিক কাঠামোকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে কৌতূহল রয়েছে। অনেকে এটিকে নূহ (আ.)-এর নৌকার সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষ বলে দাবি করে আসছেন। তবে এখন পর্যন্ত এ দাবির পক্ষে চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কাঠামোটির প্রকৃতি নির্ধারণে সম্প্রতি মাঠপর্যায়ের নতুন গবেষণা শেষ করেছে সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষক দল। গবেষণায় কোর ড্রিলিং, ভূগর্ভস্থ রাডার স্ক্যান, ড্রোন জরিপ এবং মাটির নমুনা সংগ্রহের মতো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণা দলের উপপ্রধান ও মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোনস জানান, বিভিন্ন স্থান থেকে মাটির প্রায় এক হাজার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। কোর ড্রিলিংয়ের মাধ্যমেও ভূগর্ভের নমুনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাডার স্ক্যানে কাঠামোটির নিচে কিছু অস্বাভাবিকতা শনাক্ত হয়েছে।
তবে এসব প্রাথমিক তথ্যকে নূহ (আ.)-এর নৌকার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। নমুনাগুলো বর্তমানে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। গবেষণার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আগামী বছরের এপ্রিল বা মে মাসে পাওয়া যেতে পারে।
১৯৫৯ সালে কাঠামোটির সন্ধান
জাহাজের মতো দেখতে এই ভূতাত্ত্বিক গঠনটি প্রথম নজরে আসে ১৯৫৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। তুরস্কের সশস্ত্র বাহিনীর ম্যাপিং ইঞ্জিনিয়ার ইলহান দুরুপিনার পূর্ব আনাতোলিয়া অঞ্চলে বিমান থেকে জরিপ চালানোর সময় এটি শনাক্ত করেন।
এরপর থেকেই কাঠামোটিকে ঘিরে নূহ (আ.)-এর নৌকার সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে নানা দাবি ও গবেষণা শুরু হয়। তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের গবেষকেরা সময় সময় এলাকাটিতে অনুসন্ধান চালিয়েছেন।
সর্বশেষ গবেষণা প্রকল্পটি শুরু হয় চলতি বছরের মে মাসে। সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সেনকার আতিলার নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় পাঁচটি দেশের প্রায় ২০ জন বিজ্ঞানী অংশ নেন। গবেষকেরা তেলচেকার ও উজেঙ্গিলি গ্রামের মধ্যবর্তী এলাকায় প্রায় ৯০ দিন কাজ করেন।
গবেষণার অংশ হিসেবে ড্রোনের সাহায্যে এলাকার ত্রিমাত্রিক ভূখণ্ডের মডেল তৈরি করা হয়। ভূগর্ভের গঠন শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হয় আধুনিক গ্রাউন্ড-স্ক্যানিং রাডার। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থান থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
কাঠামোটি প্রাকৃতিক নাকি মানবসৃষ্ট?
গবেষক অ্যান্ড্রু জোনসের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুসন্ধানে কাঠামোটিকে কোনো একক পাথরের বিশাল খণ্ড হিসেবে পাওয়া যায়নি। কোর ড্রিলিংয়ের সময় বিভিন্ন স্তর থেকে মাটির নমুনা পাওয়া গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কাঠামোটি মানুষের তৈরি—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো হয়নি। গবেষকদের মতে, এটি প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে; আবার এর মধ্যে মানব কর্মকাণ্ডের কোনো চিহ্ন রয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষার বিষয়।
ভূগর্ভে গাঢ় রঙের কিছু মাটির স্তরও শনাক্ত হয়েছে। এগুলো পচে যাওয়া জৈব পদার্থ, কাঠের অবশেষ নাকি অন্য কোনো প্রাকৃতিক উপাদানের অংশ—তা পরীক্ষাগার বিশ্লেষণের পরই জানা সম্ভব হবে।
২০১৯ সালের ভূগর্ভস্থ রাডার তথ্যেও কাঠামোটির নিচে কিছু অস্বাভাবিক অংশের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। নতুন গবেষণায় সেই তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে সংগৃহীত নমুনা ও কোর ড্রিলিংয়ের ফলাফল মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
নূহ (আ.)-এর নৌকার অস্তিত্ব কি প্রমাণিত?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে ইতোমধ্যে দাবি করা হয়েছে, নতুন গবেষণায় নূহ (আ.)-এর নৌকার অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে গবেষণা দলের পক্ষ থেকে এমন কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
অ্যান্ড্রু জোনসও এ ধরনের দাবির বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো পরীক্ষাগারে চলছে। রাডার ডেটা, মাটির নমুনা ও কোর ড্রিলিংয়ের ফলাফল সমন্বয় করে চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করা হবে।
অর্থাৎ, বর্তমানে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—এটি একটি অস্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক কাঠামো, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নূহ (আ.)-এর নৌকার দাবিকে ঘিরে গবেষণা চলছে। তবে এটিই নূহ (আ.)-এর নৌকার ধ্বংসাবশেষ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো প্রকাশিত হয়নি।
ইতি/
