, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 28° সে. | 💧 আদ্রতা 87%

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যে উত্তপ্ত সংসদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদের পরিবেশ। প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের প্রতিবাদ, হইচই ও হট্টগোলে প্রায় ১০ মিনিট কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একপর্যায়ে হস্তক্ষেপ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনের প্রশ্নোত্তর পর্বে এ ঘটনা ঘটে। পরে স্পিকার সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সদস্যদের সংসদীয় বিধিবিধান মেনে চলার আহ্বান জানান।

ঘটনার সূত্রপাত হয় বিরোধী দলের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদের সম্পূরক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ছিনতাই, সংসদ সদস্যদের নিরাপত্তা এবং বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চান তিনি।

প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রশ্নটি তিনি প্রথমে পুরোপুরি শুনতে পারেননি। পরে প্রশ্নটি পুনরায় করা হলে তিনি মন্তব্য করেন, ‘শাহবাগ স্কয়ারে বক্তৃতা দেওয়া আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেওয়া এক কথা না।’ তাঁর এই বক্তব্যের পরপরই বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিবাদ শুরু করেন এবং কয়েকজন নিজ নিজ আসনে দাঁড়িয়ে যান।

এর আগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর একটি প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়েও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্নটির ধরন নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। ওই সময়ও সংসদে মৃদু আপত্তি উঠেছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিরোধী দলের প্রতিবাদের মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরে তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহারের কথা জানান। তবে তাতেও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। বিরোধী সদস্যদের হট্টগোল অব্যাহত থাকলে একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বক্তব্য শেষ না করেই আসনে বসে যেতে দেখা যায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকার বারবার সংসদ সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সংসদে প্রত্যেকের কথা বলার অধিকার রয়েছে এবং যুক্তি ও বক্তব্যের মাধ্যমে মতের বিরোধ মেটানো উচিত। একই সঙ্গে অন্যের বক্তব্য বাধাগ্রস্ত না করার জন্যও সদস্যদের সতর্ক করেন।

একপর্যায়ে স্পিকার বলেন, সংসদ সদস্যদের একে অপরকে কথা বলার সুযোগ না দেওয়ার প্রবণতা সংসদের জন্য ভালো লক্ষণ নয়। তিনি জানান, সংসদের কার্যপ্রণালির বিধি মেনে চলা প্রত্যেক সদস্যের দায়িত্ব। নিয়ম ভঙ্গ হলে সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন।

ঘটনাটি নিয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও আপত্তি জানানো হয়। বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য ছিল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য ও শব্দচয়ন সংসদ সদস্যদের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্যদিকে স্পিকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুই পক্ষকেই ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।

সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রশ্নোত্তর পর্ব সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন, আর মন্ত্রীরা তার জবাব দেবেন—এটাই সংসদীয় ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

তবে মতবিরোধ যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা একে অপরের বক্তব্য বন্ধ করে দেওয়ার পর্যায়ে না যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল যেমন বিরোধী দলের প্রশ্ন ও সমালোচনাকে গুরুত্ব দেওয়ার দায়িত্ব বহন করে, তেমনি বিরোধী দলেরও সংসদের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ কার্যকর রাখতে তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ—সরকারের জবাবদিহি, বিরোধী দলের দায়িত্বশীল প্রতিবাদ এবং স্পিকারের নিরপেক্ষ ভূমিকা। সংসদে মতের পার্থক্য থাকবে; কিন্তু সেই পার্থক্য প্রকাশের পদ্ধতিই সংসদীয় সংস্কৃতির মান নির্ধারণ করে।

২৭ আগস্টের ঘটনাটি তাই শুধু একটি দিনের হট্টগোল নয়; বরং দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে পারস্পরিক সহনশীলতা, শালীনতা ও গণতান্ত্রিক চর্চা কতটা কার্যকর হচ্ছে—সে প্রশ্নও সামনে এনেছে।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত