দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরের ডিজিটাল অবকাঠামোকে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ (Critical Information Infrastructure—CII) হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। এর ফলে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা জাতীয় পর্যায়ের সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় এসেছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ধারা ১৫ অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে সিআইআই হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রজ্ঞাপনটি জারির সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, জাহাজ চলাচল, শুল্ক ও রাজস্ব প্রক্রিয়াকরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যবস্থা সরাসরি যুক্ত। এসব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সাইবার হামলা বা প্রযুক্তিগত বিঘ্ন ঘটলে দেশের আমদানি-রপ্তানি, শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই বন্দরের ডিজিটাল অবকাঠামোকে বিশেষ নিরাপত্তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সিআইআই হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আগে নির্ধারিত মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হওয়ার পর চবক সিআইআই সনদ অর্জন করে। এর ফলে বন্দরের তথ্য অবকাঠামোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিচালনার পাশাপাশি বন্দর ব্যবহারকারী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও কাঠামোবদ্ধভাবে গুরুত্ব পাবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরকে অন্তর্ভুক্ত করার আগে দেশে ৩৬টি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। নতুন এই অন্তর্ভুক্তির ফলে বন্দরের ডেটা সেন্টার, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ডেটাবেজ, বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন এবং এপিআইভিত্তিক তথ্য আদান-প্রদানের অবকাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থাগুলো উচ্চতর নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আসবে।
সিআইআই হিসেবে ঘোষণার পর বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমগুলোতে নির্ধারিত সাইবার নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। এর মধ্যে ২৪ ঘণ্টা সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ, সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার (SOC) ও সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (CIRT) পরিচালনা, নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, দুর্বলতা যাচাই এবং অনুপ্রবেশ পরীক্ষা অন্যতম।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের এনক্রিপ্টেড ও অফলাইন ব্যাকআপ, ব্যবসায়িক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা, দুর্যোগের পর দ্রুত সেবা পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা এবং এসব ব্যবস্থার নিয়মিত পরীক্ষা করার বিষয়ও সিআইআই নিরাপত্তা কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোর ব্যবস্থাও থাকবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সিআইআই ঘোষণার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে একটি বিশেষায়িত সাইবার নিরাপত্তা দল গঠন, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি, নিরাপত্তা নীতিমালা হালনাগাদ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত বন্দরের কৌশলগত ও জাতীয় গুরুত্বের স্বীকৃতি। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে বন্দরের নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম নিশ্চিত করা জাতীয় দায়িত্ব।
তিনি বলেন, বন্দরের ডিজিটাল কার্যক্রম যত বাড়ছে, সাইবার ঝুঁকিও তত বাড়ছে। তাই সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু তথ্যপ্রযুক্তির বিষয় হিসেবে না দেখে বন্দরের অপারেশনাল ধারাবাহিকতা, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চেয়ারম্যান আরও জানান, বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো ও ডিজিটাল সেবা সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সাইবার হুমকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হবে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগের ফলে আমদানি-রপ্তানিকারক, শিপিং এজেন্ট, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ বন্দর ব্যবহারকারীদের জন্য ডিজিটাল সেবার নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়বে। একই সঙ্গে বন্দরের ডিজিটাল কার্যক্রমে সম্ভাব্য সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও আরও শক্তিশালী হবে।
উল্লেখ্য, সিআইআই হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার অর্থ বন্দরের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সরকার সরাসরি গ্রহণ করছে না। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষই এসব অবকাঠামোর মালিক ও পরিচালনাকারী থাকবে; তবে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোগুলো জাতীয় পর্যায়ের সাইবার নিরাপত্তা তদারকি ও নির্ধারিত নিরাপত্তা মানদণ্ডের আওতায় পরিচালিত হবে।
ইতি/
