চট্টগ্রামে দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। একই সঙ্গে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ। অসুস্থ হয়ে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিম্নআয়ের অনেক রোগী নিজেদের জমানো অর্থ শেষ করে এখন আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে চিকিৎসা চালাচ্ছেন। হাসপাতালেও শয্যার সংকট দেখা দিয়েছে; নির্ধারিত বেডের বাইরে মেঝেতে রেখেও রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে এমনই চিত্র দেখা গেছে। ডেঙ্গু ওয়ার্ডের বাইরে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন ফেনীর বাসিন্দা বেলায়েত হোসেন (৩৮)। কয়েক দিন আগে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর প্রথমে ফেনীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। পরে অবস্থার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন।
তবে হাসপাতালে এসে শয্যা পাননি বেলায়েত। জায়গা হয়েছে ওয়ার্ডের বাইরে মেঝেতে। শারীরিক দুর্বলতা ও শরীরজুড়ে ব্যথার মধ্যেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁকে।
পেশায় দোকানের কর্মচারী বেলায়েতের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস তাঁর উপার্জন। অসুস্থ হয়ে কাজে যেতে না পারায় একদিকে যেমন আয় বন্ধ হয়েছে, অন্যদিকে বাড়ছে চিকিৎসার ব্যয়। শুরুতে নিজের জমানো টাকা দিয়ে চিকিৎসা চালালেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য খরচ মেটাতে এখন আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার নিতে হচ্ছে।
বেলায়েতের স্ত্রী ও তাঁদের ১৪ মাস বয়সী সন্তানও তাঁর সঙ্গে হাসপাতালে অবস্থান করছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাসপাতালে চিকিৎসা চললেও শয্যা না পাওয়ায় মেঝেতেই থাকতে হচ্ছে তাঁদের।
নির্ধারিত বেডের প্রায় দ্বিগুণ রোগী
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা রয়েছে ৪০টি। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত সেখানে ভর্তি ছিলেন ৭৮ জন। অর্থাৎ নির্ধারিত শয্যার চেয়ে ৩৮ জন বেশি রোগী থাকায় অনেককেই মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে দেখা যায়, মেঝেতে থাকা রোগীদের পাশে স্বজনেরা অবস্থান করছেন। কেউ ওষুধ সংগ্রহ করছেন, কেউ পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজপত্র নিয়ে ব্যস্ত। চিকিৎসকেরাও নিয়মিত রোগীদের পর্যবেক্ষণ করছেন।
দায়িত্বরত চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম তিন দিনে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ৩০ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে আসছেন। তাঁদের মধ্যে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জেলার রোগী রয়েছেন।
ফেনীর আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ আবুল হাসেম (৫০)ও তাঁদের একজন। দোকানের কর্মচারী হাসেমের ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর প্রথমে ফেনী সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থার উন্নতির জন্য তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে নিজের অর্থের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও সহায়তা নিতে হয়েছে তাঁকে।
জটিলতা বাড়ছে ডেঙ্গুতে
চিকিৎসকেরা বলছেন, এবারের ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা যাচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রে জ্বর চলাকালীনই শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। আবার জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগী পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত হচ্ছেন না।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট ও ডেঙ্গুর ফোকাল পারসন নূর মোহাম্মদের মতে, ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা জ্বর কমার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। রোগীর শারীরিক পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। বিশেষ করে অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি বেশি।
তীব্র দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, প্রচণ্ড পেটব্যথা, বারবার বমি, অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ কিংবা আচরণে পরিবর্তনের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
আগস্টেই আক্রান্ত ১ হাজার ২০২ জন
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। জুনে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১২২ জন। জুলাইয়ে তা বেড়ে হয় ৫৩৬ জন। আগস্টে এক মাসেই আক্রান্ত হন ১ হাজার ২০২ জন।
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৮৩৪ জন। বিপরীতে শুধু আগস্টেই আক্রান্তের সংখ্যা সেই হিসাবকে ছাড়িয়ে গেছে।
২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে চলতি বছরে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৮৬ জনে। এর মধ্যে নগরের ৯৩৬ জন, চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার ৯৫৫ জন এবং অন্যান্য জেলা থেকে এসে চট্টগ্রামে চিকিৎসা নেওয়া ২৯৫ জন রয়েছেন। এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে চাপও বাড়ছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য দীর্ঘ সময়ের চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি করছে।
ইতি/
