, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 28° সে. | 💧 আদ্রতা 88%

চট্টগ্রামে প্রশ্নের মুখে সরকারি অর্থের ব্যয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম নগরে মানুষের চলাচল সহজ করতে নির্মাণ করা হয়েছে সেতুদ, গাড়ি রাখার জন্য তৈরি হয়েছে মাল্টিলেভেল পার্কিং, খাদ্য পরীক্ষার জন্য বানানো হয়েছে আধুনিক গবেষণাগার। কেনা হয়েছে অ্যাম্বুলেন্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী গাড়িও।

কিন্তু এসবের অনেকগুলোই এখন পড়ে আছে অব্যবহৃত বা প্রায় অকার্যকর অবস্থায়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—সিডিএর এমন অন্তত ১১টি প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৪২ কোটি টাকা। প্রকল্প নেওয়ার আগে প্রয়োজনীয়তা ও ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না—এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।

রাজাখালী খালের ওপর যান চলাচল নির্বিঘ্ন করতে প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ৭০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু। কিন্তু সেতুর দুই পাশে নেই সংযোগ সড়ক। ফলে নির্মাণের প্রায় চার বছর পরও এটি কার্যত ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এখন সেতুটিকে কাজে লাগাতে নতুন করে সংযোগ সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হচ্ছে।

একই চিত্র নগরের নিউমার্কেটের মাল্টিলেভেল কার পার্কিংয়ে। ২০১৭ সালে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে সাততলা স্থাপনাটি নির্মাণ করা হলেও এর ব্যবহার সীমিত।

শুধু সেতু কিংবা পার্কিং নয়—অব্যবহৃত প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে দুটি বিপণিবিতান, একটি খাদ্য পরীক্ষাগার, আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স, খাদ্য পরীক্ষার গাড়ি, ধুলা পরিষ্কারের ছয়টি গাড়ি এবং জলাশয় থেকে বর্জ্য অপসারণের একটি গাড়িও।

সিডিএর দুটি বিপণিবিতানেই ব্যয়ের অঙ্ক প্রায় ৯৫ কোটি টাকা।

সল্টগোলা শপিং কমপ্লেক্সের নির্মাণ শেষ হয় ২০২২ সালে। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ছয়তলা এই ভবনে রয়েছে লিফট, এসকেলেটর, পার্কিং ও অন্যান্য আধুনিক সুবিধা। কিন্তু চার বছর পেরিয়েও বিপণিবিতানটি চালু হয়নি। ১৮৬টি দোকানের মধ্যে ৮২টি বিক্রি হলেও ব্যবসা শুরু করতে পারেননি ক্রেতাদের অনেকে।

অন্যদিকে নিউমার্কেটের সিডিএর বি-ব্লক বিপণিবিতানের নির্মাণ শেষ হয়েছিল আরও আগে। কিন্তু ভবনটির বড় অংশ এখনো বাণিজ্যিকভাবে সক্রিয় নয়। পানি নিষ্কাশন ও অবকাঠামোগত সমস্যার কথাও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সিডিএ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পরিকল্পনার মাধ্যমে এগুলো ব্যবহারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিবিরহাটে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত খাদ্য পরীক্ষাগারটিও চালু হয়নি প্রায় এক দশকে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত এই ল্যাবে রয়েছে ৮২টি আধুনিক পরীক্ষার সরঞ্জাম। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের অনুমোদন না থাকায় কার্যক্রম শুরু করা যায়নি বলে জানিয়েছে সিটি করপোরেশন।

এমনকি ওই ল্যাবের জন্য পাওয়া আনুমানিক দুই কোটি টাকা মূল্যের খাদ্য পরীক্ষার গাড়িটিও ব্যবহার হয়নি।

নগর পরিষ্কার রাখতে কেনা ও পাওয়া ধুলা পরিষ্কারের ছয়টি গাড়ির অবস্থাও একই। এসব গাড়িতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অথচ নগর পরিষ্কারে এগুলোর কার্যকর ব্যবহার দেখা যায়নি।

২০২২ সালে ভারত সরকারের উপহার দেওয়া আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সও নিয়মিত রোগী পরিবহনে তেমন ব্যবহার হয়নি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পাশাপাশি জলাশয় থেকে কচুরিপানা ও ভাসমান বর্জ্য অপসারণের জন্য দেওয়া উইড হারভেস্টারও চট্টগ্রামের বাস্তবতায় কতটা কার্যকর—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে শুধু নির্মাণ ব্যয় নয়—প্রকল্পটি আদৌ প্রয়োজনীয় কি না, পরিচালনার জন্য জনবল আছে কি না এবং ভবিষ্যতে এর রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে হবে—এসব বিষয়ও নিশ্চিত করা জরুরি।

কারণ পরিকল্পনার ঘাটতি থাকলে উন্নয়নের নামে ব্যয় হওয়া বিপুল সরকারি অর্থ শেষ পর্যন্ত জনসেবায় না এসে পরিণত হতে পারে অব্যবহৃত অবকাঠামোতে

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত