চট্টগ্রামে অনিরাপদ পানি, পানির সংকট ও দুর্বল স্যানিটেশনব্যবস্থার কারণে ডায়রিয়া ও কলেরার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ২৬ হাজার ৬০২ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। শুধু আগস্ট মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭৮১ জন।
সম্প্রতি নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার চন্দ্রনগর এলাকায় একটি কলোনিতে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবের ঘটনাও বিষয়টি সামনে এনেছে। গত ১৭ জুলাই সেখানে দুই দিনের মধ্যে অন্তত ১৭ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তাঁদের মধ্যে আবদুল মতিন (৭৫) নামে একজনের মৃত্যু হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কলোনির পানি সংরক্ষণের ট্যাংকটি অপরিষ্কার ছিল। পরে সেখানে মৃত ইঁদুর ও তেলাপোকা পাওয়া যায়। ঘটনার পর সিটি করপোরেশন ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা পানি পরীক্ষা করেন। প্রাথমিকভাবে অপরিষ্কার ট্যাংকের পানিকে ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০২৩ সালের প্রাদুর্ভাবেও উঠে এসেছিল পানির দূষণ
চট্টগ্রামে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি নতুন নয়। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় তীব্র ডায়রিয়ার বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। প্রায় দেড় মাসে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হন ৭ হাজার ৯৫৬ জন।
ওই প্রাদুর্ভাব নিয়ে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গবেষকদের করা অনুসন্ধানে পানির নিরাপত্তা, স্যানিটেশন, পানির সংকট ও পানি বিশুদ্ধ না করার মতো একাধিক ঝুঁকি চিহ্নিত হয়।
গবেষণাটি চলতি বছরের ২৫ জুলাই Health Science Reports সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম গোমদণ্ডীর কয়েকটি পানির উৎসে দূষণের চিত্র ছিল। পরীক্ষা করা তিনটি নলকূপের মধ্যে দুটির পানিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়। পাঁচটি পুকুরের নমুনাতেও কলিফর্ম শনাক্ত হয়।
এ ছাড়া একটি নলকূপ ও পাঁচটি পুকুরের পানিতে Vibrio cholerae পাওয়া যায়। তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এসব পানির জীবাণুর সঙ্গে রোগীদের শরীরে পাওয়া কলেরার জীবাণুর সরাসরি সম্পর্ক জিনগত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে ওই পানির উৎস থেকেই রোগীরা আক্রান্ত হয়েছেন—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।
নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিয়ে উদ্বেগ
গবেষণায় মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে কিছু পুকুরে শৌচাগারের বর্জ্য মিশে যাওয়ার ঘটনাও উঠে এসেছে। কয়েকটি নলকূপ আবার শৌচাগারের কাছাকাছি অবস্থানে ছিল।
বোয়ালখালীর ৯৬ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৮০ জন পানি ব্যবহারের আগে তা বিশুদ্ধ করতেন না। অন্যদিকে নগরের ৭০ রোগীর মধ্যে ৩৭ জন পানির সংকটের কথা জানিয়েছেন এবং ৩৩ জন পানি বিশুদ্ধ না করার কথা বলেছেন।
গবেষকেরা অবশ্য কোনো একটি কারণকে ২০২৩ সালের ডায়রিয়া বা কলেরা প্রাদুর্ভাবের একক উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেননি। বরং অনিরাপদ পানির উৎস, পানির সংকট, লবণাক্ততা, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন এবং পানি বিশুদ্ধ না করার মতো একাধিক ঝুঁকি একই সময়ে বিদ্যমান ছিল বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন।
ওয়াসার পানিকে সরাসরি দায়ী করা হয়নি
নগরের রোগীদের একটি বড় অংশ খাবার পানির প্রধান উৎস হিসেবে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানির কথা জানিয়েছেন। তবে গবেষণায় ওয়াসার সরবরাহ করা পানির কোনো নমুনা পরীক্ষা করা হয়নি। তাই ওয়াসার পানি থেকেই রোগ ছড়িয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত গবেষণায় দেওয়া হয়নি।
গবেষকেরা মনে করেন, পানি সরবরাহ অনিয়মিত হলে পাইপলাইনের ভেতরের চাপ কমে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পাইপ দিয়ে বাইরের দূষিত পানি ঢোকার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে এই বিষয়টিকেও তাঁরা সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে দেখেছেন, সরাসরি সংক্রমণের কারণ হিসেবে নয়।
বছরে দুই সময়ে বাড়ে ডায়রিয়ার প্রবণতা
আগের কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা চট্টগ্রামে ডায়রিয়া বৃদ্ধির দুটি সময়ের প্রবণতা পেয়েছেন—এপ্রিল থেকে জুন এবং আগস্ট থেকে অক্টোবর। ২০২৩ সালের বড় প্রাদুর্ভাবও হয়েছিল বর্ষা শুরুর আগের সময়ে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সময়ে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পানির উৎস, পাইপলাইন ও বাসাবাড়ির সংরক্ষণ ট্যাংকের পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বির মতে, ডায়রিয়া ও কলেরার মতো পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে শুধু পান করার পানি নয়, রান্না ও খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত পানিও নিরাপদ হওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, নলকূপ স্থাপনের ক্ষেত্রে শৌচাগার ও পয়োবর্জ্যের উৎস থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে পুকুরে যাতে শৌচাগারের বর্জ্য না মেশে এবং বাসাবাড়ির পানির ট্যাংক নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
করণীয় কী
গবেষকদের সুপারিশ অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ডায়রিয়া ও কলেরার ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ, নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা, পাইপলাইন ও পানির ট্যাংকের রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্যানিটেশনব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
কোনো এলাকায় হঠাৎ ডায়রিয়া রোগী বেড়ে গেলে শুধু চিকিৎসার ব্যবস্থা নয়—একই সঙ্গে ওই এলাকার পানির উৎস, সংরক্ষণব্যবস্থা ও স্যানিটেশন পরিস্থিতিও দ্রুত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এতে সম্ভাব্য দূষণের উৎস শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
ইতি/
