জাতি ঘুষ ও দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন চাই-মো. কামাল উদ্দিন

দুর্নীতি ও ঘুষের ইতিহাস খুবই প্রাচীন; সভ্যতার সমবয়সী বলা চলে। সেই অসভ্যতার কবলে পড়ে আমরা আজ দিশেহারা অবস্থায় আছি। একটি দেশকে ধ্বংসের জন্য দুর্নীতি ও ঘুষই যথেষ্ট। সরকারি চাকরির প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো সহজে ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। সরকারি চাকরিতে বেতন যাই হোক না কেন, উপরি আয়ের আশা করেই অনেকে সরকারি চাকরিতে যোগদান করে। ঘুষ ও দুর্নীতি এখন একটি নেশার মতো পরিণত হয়েছে, যা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। আজ দুর্নীতিবাজরা দেশ ও সমাজে প্রভাব বিস্তার করে চলছে। দেশের উন্নয়নের সিংহভাগ টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করে গিলে খাচ্ছে। এই দুর্নীতিবাজরা সমাজের সবখানে স্থান করে নিয়েছে। দেশে যত ধরণের অরাজকতা সৃষ্টি হচ্ছে, সব কিছুর সাথে এই দুর্নীতিবাজরা জড়িত। তাই এই মুহূর্তে দেশে একটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রয়োজন রয়েছে।

বর্তমানে সরকারি চাকরিতে ছোট-বড় সব ধরনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ঘুষ ও দুর্নীতির প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। শুধু তাই নয়, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরাও এতে পিছিয়ে নেই। তাদের পাশাপাশি সমাজের এবং দেশের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যাঁরা লেখনীর মাধ্যমে প্রতিরোধের ভূমিকা পালন করার কথা ছিল, যাঁদের ওপর মানুষ আশাবাদী, সেই কলম সৈনিকরাও কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির সাথে জড়িত হয়ে দেশ ও জাতিকে সর্বনাশ করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়। এ কথা ভাবতে নিজেকেও অপরাধী মনে হয়, যেহেতু আমি নিজেও একজন অক্ষরজীবী। আমরা আগে থানা প্রশাসনকে বলতাম ঘুষ ও দুর্নীতির রমরমা প্রতিষ্ঠান, কিন্তু এখন পুলিশ ঘুষ বাণিজ্যে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বর্তমানে এগিয়ে আছে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা, শিক্ষা দপ্তর, স্বাস্থ্য দপ্তর, কাস্টমস, পাসপোর্ট অফিস, ভূমি অফিস, আদালত প্রাঙ্গণ—যা এখন প্রকাশ্য দিবালোকে ধৃষ্টতার সাথে ঘুষ ও দুর্নীতি করছে। সেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পৌরসভা, নির্বাচন অফিস, বন্দর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, গণপূর্ত, সড়ক বিভাগসহ সব প্রতিষ্ঠান এখন দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এখন যে যত বেশি দুর্নীতি করতে পারে, তার তত বেশি সমাজে কদর রয়েছে। এই পরিস্থিতি সমাজের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। দুর্নীতিবাজদের কারণে সমাজে বৈষম্যতা সৃষ্টি হচ্ছে। যারা দুর্নীতি মুক্ত থাকতে চায় বা দুর্নীতির ধারেকাছে নেই, তারা প্রতিনিয়ত দুর্নীতিবাজদের হাতে বিভিন্নভাবে অপমানিত হচ্ছে। দুর্নীতিবাজদের দাপটের সাথে টিকে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

আজকের এই বৈষম্য ও অরাজকতা থেকে রক্ষা পেতে হলে সবাইকে একসাথে দুর্নীতি ও ঘুষের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। প্রয়োজনে দুর্নীতিবাজকে চিহ্নিত করে তাকে সমাজচ্যুত করতে হবে। দুর্নীতিবাজ পরিবারের সাথে আত্মীয়তা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। দুর্নীতিবাজদের ঘৃণ্য মানুষ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে এলাকায় ব্যানার, পোস্টারসহ বিভিন্ন প্রচারমূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যেহেতু দুর্নীতিবাজদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না এবং দুর্নীতি দমনে নানা কারণে ব্যর্থ হচ্ছে, তাই দুর্নীতি ও ঘুষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতার মাধ্যমে কঠোরভাবে জনমত গঠন করা এখন সময়ের দাবি।

 

যে সকল প্রতিষ্ঠানের কথা আমি উল্লেখ করেছি, সেই সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের তালিকা প্রকাশের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি দুর্নীতি ও ঘুষের টাকায় কোনো ধরনের খাওয়াদাওয়ার আয়োজন থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যদিকে, দুর্নীতি ও ঘুষের টাকা যেসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান করা হয়, সেই দান গ্রহণ থেকেও দানগ্রহীতাদের বিরত থাকতে হবে।

 

এখন দেশে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের জোয়ার শুরু হয়েছে। এই জোয়ারের সফলতা ধরে রাখতে সরকার পতনের আন্দোলনের মতো দুর্নীতি ও ঘুষের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলা সময়ের দাবি বলে আমি মনে করি। দুর্নীতির মতো একটি ব্যাধি বন্ধ করতে পারলে দেশের উন্নয়নসহ সর্বস্তরের শান্তি ফিরে আসবে।

 

শেষে একটি অপ্রিয় সত্য কথা না বললেই নয়—দুর্নীতিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে এক শ্রেণির ধান্দাবাজ চাটুকার দুর্বৃত্ত সাংবাদিকরা। আমাদের চট্টগ্রামে একাধিক সাংবাদিক রয়েছে, যারা ক্লাব ও ইউনিয়নের নেতা পদকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। তাদের সাংবাদিকতা হলো মেয়র, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ অফিস ও ভূমি অফিস—বিশেষ করে ভূমি অধিগ্রহণের টাকা পরিশোধের অথরিটি এলও শাখায় দালালি এবং চাঁদাবাজি ও তোষামোদি। তাদের এই অপকর্মের শত শত প্রমাণ রয়েছে। তাদের দেখলে সাধারণ মানুষ থুথু নিক্ষেপ করে। তারা আমাদের চট্টগ্রামের কলঙ্কিত সাংবাদিক। তাদের অবৈধ টাকার কাছে প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়ন জিম্মি হয়ে আছে। সাংবাদিক হিসেবে তাদের অপকর্মের কথা বলার আগে বলতে হয়, “ছিঃ ছিঃ ছিঃ, এই লজ্জা রাখি কোথায়?”

[recent_tabs]