চট্টগ্রাম নগরীর ওয়াসা, নলকূপ ও বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ করা জারের পানির গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে একটি গবেষণায়। গবেষণায় নগরীর বিভিন্ন এলাকার পানির নমুনা পরীক্ষা করে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ব্যাকটেরিয়া ও ভাসমান কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এমনকি বাসাবাড়িতে পানি ফুটানো বা ফিল্টারে শোধনের পরও কিছু নমুনায় জীবাণুর উপস্থিতি পুরোপুরি দূর হয়নি।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ওয়াসার অপরিশোধিত পানির বিভিন্ন নমুনায় প্রতি মিলিলিটারে ৯ হাজার ২৫০ থেকে ১৪ হাজার ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। বাসাবাড়িতে শোধনের পরও কিছু নমুনায় এই সংখ্যা ৩ হাজার ৪০০ থেকে ১০ হাজার ৩০০ পর্যন্ত ছিল।
নলকূপের পানিতেও ছিল একই ধরনের উদ্বেগ। অপরিশোধিত নমুনায় প্রতি মিলিলিটারে ৬৮০ থেকে ১৩ হাজার ৫০০ এবং শোধনের পর ৬৮০ থেকে ১০ হাজার পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হয়েছে। বাণিজ্যিক জারের পানিতে অপরিশোধিত অবস্থায় প্রতি মিলিলিটারে ১৫০ থেকে ১ হাজার এবং শোধনের পর ১০০ থেকে ৬৫০ ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে।
প্রতি ফোঁটায় শত শত ব্যাকটেরিয়া
গবেষণার একটি তথ্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে চান্দগাঁও এলাকার ওয়াসার পানিকে ঘিরে। সেখানে অপরিশোধিত পানিতে প্রতি মিলিলিটারে ১৪ হাজার ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়। এক মিলিলিটার পানিতে আনুমানিক ২০ ফোঁটা ধরলে প্রতি ফোঁটায় জীবাণুর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৭০০।
বন্দর এলাকার নলকূপের পানির একটি নমুনায় প্রতি মিলিলিটারে ১৩ হাজার ৫০০ ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়, যা প্রতি ফোঁটায় আনুমানিক ৬৭৫টির সমান। শোধনের পরও প্রতি মিলিলিটারে প্রায় ১০ হাজার ব্যাকটেরিয়া থাকায় প্রতি ফোঁটায় সংখ্যাটি প্রায় ৫০০ হয়।
ভাসমান কণাতেও বাড়ছে উদ্বেগ
শুধু ব্যাকটেরিয়া নয়, পানিতে থাকা ভাসমান ক্ষুদ্র কণার পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে গবেষণায়। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী পানযোগ্য পানিতে এ ধরনের কণার গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ১০ মিলিগ্রাম। কিন্তু গবেষণায় ওয়াসা ও নলকূপের পানির কিছু নমুনায় এর পরিমাণ ৪০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮৮৮ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কোতোয়ালি এলাকার ওয়াসার পানির একটি ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে শোধনের পর ভাসমান কণার পরিমাণ কমার পরিবর্তে বেড়েছে। গবেষকদের ধারণা, বাসাবাড়ির ফিল্টার ও পানির সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়মিত পরিষ্কার না করা কিংবা ফিল্টারে ত্রুটি থাকার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতাতেও অসন্তোষ
জরিপে অংশ নেওয়া ওয়াসার পানি ব্যবহারকারীদের ৭৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা পানিকে সরাসরি পানের উপযোগী মনে করেন না। তাদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ পানিতে দুর্গন্ধ এবং ১৭ শতাংশ ভাসমান কণা থাকার অভিযোগ করেছেন।
নলকূপ ব্যবহারকারীদের ৫৮ শতাংশ পানিতে অস্বাভাবিক বাদামি রঙের কথা জানিয়েছেন। শোধনের পরও ওয়াসার পানি ব্যবহারকারীদের ১১ শতাংশ এবং নলকূপের পানি ব্যবহারকারীদের ৯ শতাংশ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছেন। উভয় উৎসের পানি ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৭ শতাংশ জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার কথাও জানিয়েছেন। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এসব স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্তদের বড় অংশই শিশু।
দূষণের সম্ভাব্য উৎস কোথায়?
গবেষকদের মতে, চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্ণফুলী ও হালদা নদীর পানি শোধনের মাধ্যমে নগরীতে সরবরাহ করে। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে পাইপলাইনের ফুটো, ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটি কিংবা অন্যান্য অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে পানি গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর আগেই দূষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে অনিবন্ধিত বা অনিয়ন্ত্রিত কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জারের পানি প্রক্রিয়াজাত করার বিষয়টিও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হিসেবে দেখছেন গবেষকেরা।
চট্টগ্রাম ওয়াসার পাইপলাইনে ফুটো নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে ওয়াসার সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়েছিল, পুরোনো পাইপলাইন ও ফুটো সংস্কারের সমস্যার কারণে ময়লা ও জীবাণু পানিতে প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গবেষকের বক্তব্য
গবেষণা দলের সদস্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শ্যামল কর্মকার বলেন, গবেষণায় পাওয়া ব্যাকটেরিয়া ও রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি দেশে পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব। তবে পানিতে এমন আরও কিছু অজৈব দূষক থাকতে পারে, যেগুলো প্রচলিত পরীক্ষায় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে শুধু পানি শোধন নয়, দূষণের উৎস চিহ্নিত করে ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানির উৎসকে দূষণমুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
ওয়াসার বক্তব্য ভিন্ন
তবে গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে একমত নয় চট্টগ্রাম ওয়াসা। সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম দাবি করেছেন, ওয়াসার সরবরাহ করা পানিতে ব্যাকটেরিয়া নেই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিতভাবে নগরীর বিভিন্ন স্পট থেকে পানি সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়।
ওয়াসার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্রাহকের বাসার রিজার্ভার, পানির ট্যাংক অপরিষ্কার থাকা এবং বিভিন্ন উন্নয়নকাজের সময় পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে গ্রাহক পর্যায়ে পানি দূষিত হতে পারে। পাইপলাইনে কোনো ধরনের ক্ষতি হলে তা দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
গবেষণার ফলাফল ও ওয়াসার বক্তব্য—দুই দিকই বিবেচনায় নিয়ে নগরীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উৎস থেকে গ্রাহকের পানির সংরক্ষণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়মিত ও স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
ইতি/
