, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 28° সে. | 💧 আদ্রতা 87%

লোডশেডিং কমাতে ফার্নেস তেলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর

নিজস্ব প্রতিবেদক

গ্যাস সরবরাহের ঘাটতিতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেপ্টেম্বর মাসে এসব কেন্দ্র থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে ২ লাখ ৪ হাজার ১০০ টন ফার্নেস তেল চেয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।

পিডিবির চাহিদাটি সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৫৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য। এসব কেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫ হাজার ৫৩৮ মেগাওয়াট।

তবে চাহিদার তুলনায় ফার্নেস তেলের সরবরাহ সক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনে বিভিন্ন খাতে ৩১ হাজার ৯০২ টন ফার্নেস তেল বিক্রি হয়েছে। ৫ সেপ্টেম্বর শেষে সরবরাহযোগ্য মজুত ছিল ১৪ হাজার ৭৫১ টন।

বিপিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি মাসের বাকি সময়ে প্রায় ১ লাখ টন ফার্নেস তেল আমদানি এবং স্থানীয় উৎস থেকে আরও ২৫ হাজার টন পাওয়ার কথা রয়েছে। এতে সেপ্টেম্বরজুড়ে সম্ভাব্য সরবরাহ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৫৩ টন। অর্থাৎ অন্যান্য খাতের চাহিদা বাদ দিলেও পিডিবির চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থাকবে প্রায় ৩২ হাজার ৪৪৭ টন।

শিল্পে বাড়তি চাহিদা, তেলের বাজারেও চাপ

গ্যাসের সংকটে শিল্পকারখানাগুলো বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ফার্নেস তেলের ব্যবহার বাড়িয়েছে। এতে জ্বালানিটির বাজারে চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সেপ্টেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনে ফার্নেস তেল বিক্রির দৈনিক গড় ছিল প্রায় ৬ হাজার ৩৮০ টন। গত বছরের একই সময়ে এ হার ছিল প্রায় ২ হাজার ১৭৭ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিক্রি প্রায় তিন গুণ হয়েছে।

ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি শিল্প খাতের বাড়তি চাহিদা মেটাতেও বিপিসির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

লোডশেডিং সামলাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুতের দিকে নজর

জ্বালানি সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহেও পড়েছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৬১৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৪ হাজার ৩৬১ মেগাওয়াট। ওই সময় ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২৫৮ মেগাওয়াট।

এর আগে আগস্টের শেষ দিকে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে ওঠে। ২৭ আগস্ট দেশের ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬২টির উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং ২০টি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ওই দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং প্রায় ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে পৌঁছায়।

গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব না হওয়ায় তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

ধাপে ধাপে তেল সরবরাহের পরিকল্পনা

পিডিবির চাহিদা অনুযায়ী একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ফার্নেস তেল সরবরাহ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে তেল সরবরাহের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

পিডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কিছু তেল ইতোমধ্যে মজুত রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি জাহাজ পথে রয়েছে এবং আরও তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে চলতি মাসে চাহিদার কাছাকাছি তেল সংগ্রহের আশা করা হচ্ছে।

তবে ২ লাখ ৪ হাজার ১০০ টনের চাহিদাটি মূলত বিপিসির মাধ্যমে ফার্নেস তেল সংগ্রহকারী কেন্দ্রগুলোর জন্য। যেসব বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তেল আমদানি করে, তাদের চাহিদা এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

তেল সংকটে উৎপাদন কমার আশঙ্কা

ফার্নেস তেলের সরবরাহে ঘাটতি থাকলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী চালানো কঠিন হবে। বিশেষ করে বিআর পাওয়ারজেন লিমিটেডের শ্রীপুর, কড্ডা ও মিরসরাই কেন্দ্রের জন্যই পিডিবি মোট ৩৫ হাজার টন ফার্নেস তেল চেয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শ্রীপুর ও কড্ডা কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিটিতে দৈনিক প্রায় ৮০০ টন করে ফার্নেস তেল প্রয়োজন। অন্যদিকে মিরসরাই কেন্দ্রে সড়কপথে তেল পরিবহনের কারণে দৈনিক সরবরাহের সক্ষমতা সীমিত।

তেলের সরবরাহ পাওয়া গেলেও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গত বছর প্রতি লিটার ফার্নেস তেলের দাম ছিল প্রায় ৭১ টাকা; বর্তমানে তা প্রায় ১০০ টাকা। ফলে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে লোডশেডিং কমানো সম্ভব হলেও এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়বে।

আমদানি ও খালাসে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা

ফার্নেস তেলের বাড়তি চাহিদা মেটাতে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও খালাস সক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানির পাশাপাশি মাসে সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ টন ফার্নেস তেল আমদানি ও খালাস করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল খালাসের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প চালু হলে এই সীমাবদ্ধতা কমতে পারে। তবে প্রকল্পটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় আকস্মিকভাবে চাহিদা বেড়ে গেলে দ্রুত আমদানি ও সরবরাহ বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ফার্নেস তেলের ওপর নির্ভরতা বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে থাকবে। তবে দীর্ঘ সময় তেলভিত্তিক উৎপাদন বাড়িয়ে রাখা হলে জ্বালানি ব্যয় এবং বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ—দুই-ই বাড়তে পারে।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত