চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আলোচিত মো. মোবারক হোসেন ওরফে ‘কালা মোবারক’ বা ‘গলাকাটা মোবারক’কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ফটিকছড়িতে অভিযানের সময় পুলিশের সঙ্গে গুলিবিনিময়ের পর তাঁকে আরও তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ভোরে ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর-পল্লানপাড়া এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় একটি বাড়ির ভেতর থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। পরে পুলিশ পাল্টা গুলি চালিয়ে মোবারকসহ চারজনকে আটক করে।
অভিযানে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৩ রাউন্ড গুলি ও ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশ। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ব্রাজিলে তৈরি একটি ৯ এমএম পিস্তল রয়েছে, যেটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া সরকারি অস্ত্র বলে জানিয়েছে পুলিশ। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।
পুলিশের দাবি, ‘প্রধান শুটার’ মোবারক
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ বলছে, মোবারক বিদেশে অবস্থানরত সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ‘বড় সাজ্জাদ’ এবং কারাগারে থাকা ডেভিড ইমনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পুলিশের ভাষ্য, ডেভিড ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
রাউজানের পাহাড়তলী এলাকায় গত ১৩ জুন যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মোবারককে শনাক্ত করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। ওই হত্যাকাণ্ডে একাধিক অস্ত্রধারীকে দেখা যায়। পরে তদন্তে মোবারকের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় মোবারক দুই হাতে অস্ত্র ব্যবহার করছিলেন। প্রথম দফায় গুলি চালানোর পর কিছুক্ষণ পর আবার ঘটনাস্থলে ফিরে গুলি করার দৃশ্যও সিসিটিভিতে ধরা পড়ে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে
হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে মোবারকের বিরুদ্ধে।
পুলিশের দাবি, চাঁদা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গুলির ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার মধ্যে হাটহাজারী ও ফটিকছড়ির কয়েকটি ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ তদন্তকারীদের হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এসব ঘটনায় মোবারকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
অপরাধজগতে প্রবেশের শুরু
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা মোবারকের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে একজনকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এরপর থেকেই তিনি ‘গলাকাটা মোবারক’ নামে পরিচিতি পান।
পুলিশের ভাষ্য, স্থানীয় বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তিনি অপরাধজগতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়।
পাহাড়ে আত্মগোপনের অভিযোগ
পুলিশ বলছে, নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ সংঘটনের পর মোবারক ফটিকছড়ি ও রাউজানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করতেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার লোকালয়ে ফিরে আসতেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
এই পাহাড়ি এলাকাকে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
তদন্তকারীরা আরও দাবি করেছেন, পাহাড়ি এলাকায় তাঁর যোগাযোগ ও আশ্রয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন।
এসএমজি নিয়ে ঘুমানোর দাবি
মোবারককে গ্রেপ্তারের পর তাঁর কাছে থাকা অস্ত্র নিয়ে পুলিশ আরও কিছু তথ্য পেয়েছে বলে জানিয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক এসএমজি ধরনের একটি অস্ত্র নিজের কাছে রাখার কথা জানিয়েছেন।
পুলিশের দাবি, ওই অস্ত্র বর্তমানে পলাতক এক সহযোগীর কাছে রয়েছে। সেটি উদ্ধারে অভিযান চলছে।
পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র কীভাবে গেল অপরাধীদের হাতে?
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটের ঘটনা ঘটে। উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে মোবারকের কাছ থেকে পাওয়া ৯ এমএম পিস্তলটি কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অভিযানের সময় ওই অস্ত্র ব্যবহার করেই পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছিল বলে পুলিশের দাবি।
এ ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে লুট হওয়া অস্ত্র কীভাবে অপরাধী চক্রের হাতে পৌঁছাচ্ছে এবং সেগুলো ব্যবহার করে একের পর এক অপরাধ কীভাবে সংঘটিত হচ্ছে।
তদন্তে সামনে আসতে পারে আরও তথ্য
পুলিশের সঙ্গে গুলিবিনিময়ের পর মোবারকসহ চারজন গ্রেপ্তার হওয়ায় চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও চাঁদাবাজির ঘটনায় নতুন তথ্য পাওয়ার আশা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে এসব অস্ত্র কোথায়, কীভাবে এবং কোন কোন অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছে—তা খতিয়ে দেখা হবে।
মোবারকের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোর পাশাপাশি তাঁর সহযোগী, অস্ত্রের উৎস এবং বিভিন্ন অপরাধে সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও তদন্ত চলছে।
ইতি/
