রাজধানীর ন্যাম ভবনে দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর দিন বাসায় উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেছেন, এলাকার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খাওয়ার পর মরিয়মের খোঁজ নিতে গিয়ে তাঁর কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পান। পরে পুলিশকে খবর দেন তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য দিয়েছেন গাজী নজরুল।
গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সংসদ সদস্য ভবন—ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ফ্ল্যাটটি গাজী নজরুলের জন্য বরাদ্দ ছিল। সেখানে তিনি তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ও দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে বসবাস করতেন।
মরিয়মের মরদেহ উদ্ধারের পর গাজী নজরুল জানিয়েছিলেন, ঘটনার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তবে ওই সময় তিনি বাসায় ছিলেন বলে স্বীকার করেছিলেন।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র জানায়, আদালত গাজী নজরুল ইসলামকে চার দিনের এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। রিমান্ডে দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগ।
তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ মঙ্গলবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁরা কিছু তথ্য দিয়েছেন, যেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
জিজ্ঞাসাবাদে মাকছুদা ইসলাম দাবি করেছেন, ঘটনার আগে মরিয়মের সঙ্গে তাঁর কোনো ঝগড়া হয়নি। মরিয়ম কেন আত্মহত্যা করেছেন, তা তিনি বুঝতে পারছেন না বলেও জানিয়েছেন।
ঘটনার সময় বাসায় ছিলেন গাজী নজরুল
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গাজী নজরুল ইসলাম জানান, সকালে বাসা থেকে বের হয়ে বিভিন্ন কাজ শেষে বেলা দুইটার দিকে ফিরে আসেন তিনি। ওই সময় এলাকার কয়েকজন নেতা-কর্মী বাসায় এসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার পর একসঙ্গে দুপুরের খাবার খান।
খাওয়া শেষে মরিয়ম খাবার খেয়েছেন কি না, তা জানতে তাঁর কক্ষের সামনে যান গাজী নজরুল। তখন দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পান। ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে পুলিশকে খবর দেন বলে তাঁর দাবি।
পরে পুলিশ গিয়ে দরজা ভেঙে কক্ষের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পায়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, গাজী নজরুল জিজ্ঞাসাবাদে মরিয়মের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো ছিল বলে দাবি করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তাঁদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও নিয়ে মরিয়ম মানসিক অশান্তিতে ছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভিডিওটি মানুষ এখনো দেখছে—এমন বিষয় নিয়ে মরিয়ম বিভিন্ন সময়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন।
পরিবারের নির্যাতনের অভিযোগ
মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহর করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। মরিয়ম বিভিন্ন সময়ে পরিবারের সদস্যদের কাছে নির্যাতনের কথা জানিয়েছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোববার মরিয়মের মরদেহ উদ্ধারের পর শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন তাঁর বাবা। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার পর গাজী নজরুল ও মাকছুদা ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলার অপর আসামি ওবায়দুর রহমানকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র। তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গত জুলাইয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি জানান, ভিডিওতে থাকা তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন।
এরপর ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে ডিবি পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ তদন্ত করছে। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
ইতি/
