, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 27° সে. | 💧 আদ্রতা 94%

খেলাপি ঋণের হারে বিশ্বে শীর্ষ তালিকায় বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা বর্তমানে খেলাপি ঋণের আওতায় রয়েছে।

আন্তর্জাতিক তুলনায়ও বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের এ চিত্র উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে খেলাপি ঋণের অনুপাতের দিক থেকে বাংলাদেশকে বিশ্বের সর্বোচ্চ অবস্থানে দেখানো হয়েছে। এর আগে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন এই সূচকে শীর্ষে ছিল। পরবর্তী সময়ে দেশটি পুরোনো খেলাপি ঋণ অবলোপন, ঋণ আদায় এবং নতুন ঋণের মান উন্নয়নের মাধ্যমে অনুপাত কমাতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশে অবশ্য খেলাপি ঋণের উচ্চহারকে শুধু নতুন করে সৃষ্টি হওয়া ঋণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে না। ব্যাংক খাতের সম্পদের মান যাচাই, অনিয়মের অনুসন্ধান এবং আগে নিয়মিত হিসেবে দেখানো কিছু সমস্যাগ্রস্ত ঋণ নতুন করে শ্রেণিকরণের ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি সামনে এসেছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তিন মাসে বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা হয়েছিল, যা ছিল ওই সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়। পরবর্তী সময়ে কিছুটা কমলেও চলতি বছরের জুনে আবারও তা ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

কেন বাড়ছে খেলাপি ঋণ

ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ঋণ যাচাই ও তদারকি, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা এবং ব্যবসায়িক পরিস্থিতির অবনতির মতো বিভিন্ন কারণে খেলাপি ঋণের চাপ বাড়ছে।

এ ছাড়া ব্যাংক খাতে আগে গোপন থাকা অনিয়মিত ঋণ, জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া ঋণ এবং প্রকৃত ঋণগ্রহীতার পরিচয় আড়াল করে বিতরণ করা ঋণের তথ্য সামনে আসায় শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণও বেড়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

ব্যাংক খাতে বাড়ছে চাপ

খেলাপি ঋণ মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান, মূলধন এবং ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিপুল পরিমাণ ঋণ অনাদায়ী থাকায় ব্যাংকের তারল্য ও আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ শ্রেণিকরণ ও সঞ্চিতি সংরক্ষণের নিয়মে পরিবর্তন এনেছে এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাইসহ বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে শুধু ঋণ পুনঃতফসিল বা অবলোপনের মাধ্যমে হিসাবের খেলাপি ঋণ কমানো গেলেও প্রকৃত অর্থ আদায় না হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে প্রকৃত ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং নতুন করে অনিয়মিত ঋণ তৈরির পথ বন্ধ করা জরুরি। একই সঙ্গে দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনাদায়ী ঋণ উদ্ধারের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত