, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 27° সে. | 💧 আদ্রতা 94%

কয়েক মিনিটেই ধ্বংস জনপদ, নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বন্যার নেপথ্যে কী?

নিজস্ব প্রতিবেদক

নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা রীতিমতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে বিস্তীর্ণ জনপদ। হঠাৎ নেমে আসা প্রবল জলস্রোত, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের তোড়ে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ভেসে গেছে। নেপালে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। আরও কয়েক শ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের তিব্বত অংশেও তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।

কীভাবে শুরু হলো এই ভয়াবহ বন্যা?

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নেপাল-চীন সীমান্তের উঁচু পার্বত্য এলাকায় একটি বরফ-পাথরের ধস বা হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ার ঘটনা থেকেই বিপর্যয়ের সূত্রপাত। ধসের ফলে লেন্দে নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা, বরফ ও পাথর একসঙ্গে নিচের দিকে ধেয়ে আসে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে নিচের দিকে নেমে আসার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে বিপুল উচ্চতার পার্থক্য অতিক্রম করে বরফ-পাথরের সেই ধস নদী উপত্যকায় প্রবল ঢলের সৃষ্টি করে।

প্রথমদিকে এই ঘটনার সঙ্গে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল। তবে পরবর্তী বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, ভূমিকম্প নয়, ভূমিধস থেকেই ওই ভূকম্পনসদৃশ সংকেত তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

এত দ্রুত প্রাণহানি কেন?

এই দুর্যোগের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক ছিল এর আকস্মিকতা। স্থানীয়দের অনেকেই কোনো আগাম সতর্কতা পাওয়ার আগেই পাহাড়ি ঢলের মুখে পড়েন। নদীর ওপরের অংশে পানি ও ধ্বংসাবশেষ আটকে যাওয়ার পর তা হঠাৎ মুক্ত হয়ে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ভয়ংকর স্রোতে পরিণত হয়।

নেপালের কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, সীমান্তের কাছে তিমুরে এলাকায় পানির বিশাল ঢেউ আঘাত হানে এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বাজার ও আশপাশের স্থাপনা ভেসে যায়। পরে স্রোত ভাটির দিকে নেমে রাস্তাঘাট, সেতু, বসতি ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস করে।

পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরাও কেন ঝুঁকিতে ছিলেন?

দুর্যোগপ্রবণ এই এলাকাটি শুধু স্থানীয় জনবসতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি তিব্বতের কৈলাস-মানসসরোবর ও লাংটাং অঞ্চলের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথ। ফলে ঘটনার সময় সেখানে বিপুলসংখ্যক পর্যটক, তীর্থযাত্রী, পরিবহনকর্মী ও স্থানীয় মানুষ অবস্থান করছিলেন।

নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষের হিসাবে শত শত পর্যটক ও ভ্রমণকারীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তী সরকারি হিসাবগুলোতে নিখোঁজের সংখ্যা আরও বেড়েছে। বিদেশিদের মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।

শুধু বন্যা নয়, সামনে আরও ঝুঁকি

দুর্যোগের পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ হয়নি। নদীর উজানে ধসের কারণে কোনো কোনো জায়গায় এখনো পানি ও ধ্বংসাবশেষ আটকে থাকতে পারে। ফলে নতুন করে বাঁধ ভেঙে দ্বিতীয় দফায় আকস্মিক বন্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া ভূমিধসের ঝুঁকিও রয়েছে। বন্যার পানিতে পাহাড়ের মাটি ও ঢাল দুর্বল হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী বৃষ্টিতে নতুন ভূমিধস তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা কতটা?

হিমালয় অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই বন্যা, ভূমিধস ও হিমবাহ-সম্পর্কিত দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমালয়ের বরফ ও হিমবাহ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে হিমবাহ ভাঙন, আকস্মিক জলপ্রবাহ এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তবে এবারের ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে সরাসরি দায়ী করার আগে আরও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। বর্তমানে সবচেয়ে জোরালো ব্যাখ্যা হলো—উঁচু পার্বত্য এলাকায় বরফ-পাথরের ধস, নদীর প্রবাহে সাময়িক বাধা এবং পরে সেই বাধা ভেঙে যাওয়া মিলেই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করেছে।

উদ্ধার অভিযান অব্যাহত

দুর্যোগের পর নেপাল সরকার সেনাবাহিনী, পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করেছে। দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টার ও অন্যান্য উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বিধ্বস্ত সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেপাল ও চীন—দুই দেশেই নিখোঁজদের সন্ধান এবং ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারে অভিযান চলছে। একই সঙ্গে নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত