চট্টগ্রামে আবারও বাড়ছে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিউমোনিয়ার জটিলতা। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল শিশুদের ক্ষেত্রে হাম থেকে নিউমোনিয়া হলে দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মহানগর ও জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৬ হাজার ৯৭৭ জন সন্দেহজনক হামের রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ৭১৬ জনের।
আগস্ট মাসেই নতুন করে ১৪১ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মহানগর এলাকায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৪৭২ এবং বিভিন্ন উপজেলায় ২৪৪ জন।
বর্তমানে চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত ২৯৬ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছেন তিনজন।
শিশু ওয়ার্ডে বাড়ছে চাপ
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপও বেড়েছে। হাসপাতালের ৮ ও ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ড এবং হামের জন্য নির্ধারিত বিশেষ ওয়ার্ডে বর্তমানে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত ১৬১ শিশু চিকিৎসাধীন।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড পরিদর্শনে দেখা যায়, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ২৪০ এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ২০১ শিশুসহ দুই ওয়ার্ডে মোট ৪৪১ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। ধারণক্ষমতার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এর আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৮ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১০ জন, মা ও শিশু হাসপাতালে পাঁচজন এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসে (বিআইটিআইডি) ১৩ জন সন্দেহজনক হামের রোগী ভর্তি হয়েছেন।
তিন মাসে শনাক্ত ৫৬০ রোগী
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুনের শেষ নাগাদ চট্টগ্রামে সন্দেহজনক হামের রোগী চিকিৎসা নিয়েছিলেন ৩ হাজার ৭৬৫ জন। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয় ৩৩১ জনের।
জুলাইয়ের শেষে চিকিৎসা নেওয়া সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ২৯০-এ। এ সময় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৫৭৫ জন।
আগস্ট শেষে সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৯৭৭ জন। অর্থাৎ জুনের শেষ থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত নতুন করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। একই সময়ে পরীক্ষায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে।
নমুনা পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগ
হাম সন্দেহে প্রতিদিন হাসপাতালে রোগী ভর্তি হলেও নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা না হওয়ায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে হাম পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাব সুবিধা সীমিত থাকায় নমুনা পরীক্ষায় বিলম্ব হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ১৯ আগস্ট ২৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। এর আগে ১৮ আগস্ট ৩৫ জন এবং ১৬ আগস্ট ৩০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এরপর টানা কয়েক দিন নতুন নমুনা পরীক্ষার তথ্য পাওয়া যায়নি।
হামের পর নিউমোনিয়াই বড় শঙ্কা
চিকিৎসকদের মতে, হামের অন্যতম গুরুতর জটিলতা নিউমোনিয়া। হাম শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দিতে পারে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং নিউমোনিয়া দ্রুত গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে।
বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা, কম ওজনের এবং আগে থেকেই দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার শিশুদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। নিউমোনিয়ার পাশাপাশি ডায়রিয়া, বমি ও পানিশূন্যতা দেখা দিলে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হতে পারে।
চট্টগ্রামের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বাসনা মহুরীর মতে, অধিকাংশ শিশু হাম থেকে কয়েক দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠলেও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা মস্তিষ্কের সংক্রমণের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে হামের পর ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও থাকে।
তিনি জানান, গুরুতর নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে শ্বাসতন্ত্রের কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে শিশুর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে অন্যান্য অঙ্গেও জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সামনে বাড়তে পারে সংক্রমণের ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋতু পরিবর্তনের সময় শিশুদের বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের প্রবণতা বাড়তে পারে। দিনের তুলনায় রাতের তাপমাত্রার পরিবর্তন, অপুষ্টি এবং শিশুদের দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মোহাম্মদ মুছা বলেন, বর্তমানে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপ অনেক বেশি। সন্দেহজনক হামের রোগীর পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাও বাড়ছে। গুরুতর অবস্থায় থাকা কিছু রোগীকে পিআইসিইউতে স্থানান্তর করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, নির্ধারিত সংখ্যক শয্যার তুলনায় রোগীর চাপ বেশি থাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রোগী শনাক্তকরণ, দ্রুত চিকিৎসা এবং জটিল রোগীদের যথাসময়ে উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তর গুরুত্বপূর্ণ।
ইতি/
